দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্তিতে সরকার বলছে, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশকে পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেয়া হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফা বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সংস্কার, সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল প্রণয়ন এবং নাগরিক সেবায় পরিবর্তনকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার।
তবে সরকারের এই সাফল্যের দাবির পাশাপাশি ছয় মাসের বাস্তবতায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও জনদুর্ভোগ সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
‘অভূতপূর্ব জনসমর্থন’
মাহদী আমিন বলেন, ছয় মাসে দেশে জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, সরকারের প্রতি এখন ‘অভূতপূর্ব জনসমর্থন’ রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ১৬ বছরের ‘ফ্যাসিবাদ’-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। নির্বাচনী ইশতেহারকে ভিত্তি করে সরকার অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীও সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফা বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, প্রতিটি দফা ধরে ধরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং এ ধরনের নজির অতীতে দেখা যায়নি।
অর্থনীতিতে সংস্কার, পে-স্কেলের দাবি
সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনীতিতে সংস্কার কার্যক্রমকে ছয় মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণ সুবিধা, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানি এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে বিশেষ তহবিলের কথা তুলে ধরা হয়।
সরকার বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের কথাও জানিয়েছে। প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
বিদ্যুৎ-গ্যাসে সবচেয়ে বড় চাপ
ছয় মাসের অর্জনের আলোচনায় সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। সাম্প্রতিক গ্যাস সঙ্কটে দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, বাসাবাড়িতে রান্নার সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ভোগান্তি বেড়েছে। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।
সরকার অবশ্য এ সঙ্কটকে শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে না। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টায় কোনো ত্রুটি নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও রয়েছে।
সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিনও বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবিলা করছে। তবে জনভোগান্তির বিষয়টি সরকার অস্বীকার করছে না বলেও তিনি জানান।
আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান সাফল্যের দাবি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার জবাবে সরকার দ্রুত বিচার ও অপরাধ দমনে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছে। মাহদী আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের একটি শিশুধর্ষণ মামলার বিচার ২৯ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একাধিক মামলায় দ্রুত রায় দেয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিনের আলোচিত মামলার আসামিদের গ্রেফতার এবং পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগকেও সরকারের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে আইনশৃঙ্খলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
সংস্কার কতদূর?
সরকারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাষ্ট্র সংস্কার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল বিএনপি। ছয় মাসে সংস্কার কার্যক্রমে সরকারের উদ্যোগ থাকলেও এর বাস্তবায়নের গতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের প্রশ্নে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার কতটা এগিয়ে নেয়া যাবে, সেটি সরকারের পরবর্তী সময়ের অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘বন্দনার রাজনীতি’ থেকে বের হওয়ার দাবি
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, বর্তমান সরকার দীর্ঘদিনের ব্যক্তি-বন্দনার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচরণ, সরল জীবনযাপন এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেন।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী জনগণের কাছাকাছি গিয়ে তাদের সমস্যা শুনছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ছয় মাসের পর আসল পরীক্ষা
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে তাই একদিকে রয়েছে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ, সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবায় পদক্ষেপ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি। অন্যদিকে রয়েছে জ্বালানি সঙ্কট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের মতো কঠিন বাস্তবতা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ছয় মাসে বিভিন্ন খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তার ভাষায়, সরকার একটি ‘ভগ্নস্তূপের’ মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে; রাতারাতি সব পরিবর্তন সম্ভব নয়। এখন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষিত উদ্যোগগুলোকে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দেয়া। বিশেষ করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রমকে রাজনৈতিক ঐকমত্যে এগিয়ে নেয়াই নির্ধারণ করবে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের দাবিগুলো কতটা টেকসই হয়।
ছয় মাসের সরকার এখন আর ‘শুরু করার’ পর্যায়ে নেই, জনগণ চাইবে কাজের ফলের হিসাব। এ কারণেই সরকারের পরবর্তী ছয় মাসকে প্রথম ছয় মাসের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



