ইতিহাস থেকে শেখ হাসিনা শিক্ষা নিলে প্রধানমন্ত্রী থেকে বিরোধীদলীয় আসনেই দৌড়াদৌড়ি করতে পারতেন বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি বলেই শেখ হাসিনাকে পালিয়ে সীমান্তের ওপারে যেতে হয়েছে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সাংবাদিক ও লেখক ইমরুল কায়েস রচিত ‘তারেক রহমান নিষিদ্ধ সময়ে নিষিদ্ধ প্রচার’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে তিনি এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, শিক্ষা আমরা নিতে পেরেছি কি না, তার প্রমাণ হচ্ছে শেখ হাসিনা। তিনি ভবিষ্যতে কী করবেন আমি জানি না, কিন্তু শেখ হাসিনা যে শিক্ষা নেননি, তা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত তার হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য পর্যন্ত স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে।
তিনি বলেন, যদি শিক্ষা নিতেন, তাহলে বড়জোর প্রধানমন্ত্রী আসন থেকে বিরোধীদলীয় আসন, বিরোধীদলীয় আসন থেকে প্রধানমন্ত্রী আসন পর্যন্তই তাকে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। তাও জনগণের সম্মতি এবং ম্যান্ডেট নিয়ে।
কিন্তু শিক্ষা নেননি বলেই তাকে দেশের সীমানার বাইরে পালিয়ে যেতে হয়েছে। আর বাকি আয়ুষকাল সমস্ত মানুষের কাছে প্রশ্নবোধক— ওই আয়ু কোথায় গিয়ে থামবে, কী পরিণতি হবে, এটাও এখন রাজনীতির গবেষণার বিষয়বস্তু।
তিনি আরো বলেন, অতএব, নিষিদ্ধ করার ক্ষমতার মধ্যে একটা আধিপত্যের নেশা থাকতে পারে। কিন্তু তার পরিণাম যে আরো কত ভয়াবহ, ভয়ঙ্কর হতে পারে— যারা ইতিহাসকে মনোযোগ দিয়ে পাঠ করে না, তারা তা বোঝে না। আর তারা সেই একই গহ্বরের মধ্যে আবার নিপতিত হয়। আমি আশা করি, ইমরুল কায়েসের ‘তারেক রহমান : নিষিদ্ধ সময়ে নিষিদ্ধ প্রচার’ বইটি আমাদের মধ্যে এই বিবেককে এবং বোধকে আরো অনেক বেশি জাগ্রত করবে।
মন্ত্রী বলেন, ফলে একদিকে যেমন যারা নিষিদ্ধ করে, তাদের মনোজগতকে বোঝার দরকার, আরেকদিকে এই ব্যর্থ চেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় জনগণের মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও আবেগ তৈরি হয় এবং তার যে কী পরিণাম হয়, তাও আমাদের বোঝা দরকার। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্ষমতার মসনদেই কেবলমাত্র এই রোগটির জন্ম নেয়— নিষিদ্ধ করা, হত্যা করা, ঘুম করা, খুন করা, কাউকে কথা বলতে না দেয়া। কখনো কখনো এই ধরনের ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতাকে আদর্শ দিয়ে আবরণ করানো হয়।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের রাজনীতির ডায়েরির পাতা যদি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এবং ২০২৫ থেকে ২৬ সাল পর্যন্ত দেখি। বিশেষ করে ৫ আগস্টের আগের দিনগুলোর একটা তালিকা যদি আমরা পড়ি, তাহলে সেখানকার রাজনৈতিক আবহ, পাতাগুলোতে সমাজ, রাজনীতি-অর্থনীতি এবং মানুষের মনোজগতের মধ্যে যে চিত্র ফুটে উঠবে, ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশে কিন্তু আবার আমরা সেই ডায়েরিতে ভিন্ন ধরনের রঙ এবং আভা খুঁজে পাই।
মন্ত্রী আরো বলেন, তারেক রহমানকে নিষিদ্ধ করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। দেশের বাইরে থেকেও যাতে তার সম্পর্কে কোনো সংবাদ অথবা তার তৈরি করা কোনো বক্তব্য দেশের মানুষ জানতে না পারে, সে কারণে তার সব ধরনের তথ্য ও প্রচারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। আর সেই নামটিকেই ইমরুল কায়েস বেছে নিয়েছেন ‘তারেক রহমান : নিষিদ্ধ সময়ে নিষিদ্ধ প্রচার’।
তিনি বলেন, বইটা ছোট হলেও মেটাফোরিক্যালি অর্থের দিক থেকে এই নামের কিন্তু অনেক বড় একটা বার্তা আছে। ইতিহাসের একটা সময় সম্পর্কে একটা প্রতীকী ধারণা এখানে দেয়া হয়েছে। আমি ইমরুল কায়েসকে ধন্যবাদ জানাই যে, তিনি তার ছোট ছোট নিবন্ধগুলোকে এক জায়গায় একত্র করে এভাবে হাজির করেছেন। অবশ্যই রাজনীতি নিয়ে যারা চিন্তা করেন, তেমন পাঠকদের জন্য এই বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংগ্রহ হয়ে থাকবে। একথা সকলেই আমরা জানি।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, তারপরও বই প্রকাশের উপলক্ষে আমাদের উচ্চারণ করতে হবে, আলোচনা করতে হবে। তারেক রহমান কেন নিষিদ্ধ সময়ে ছিলেন এবং ওই নিষিদ্ধ সময়ে তার প্রচার কেন নিষিদ্ধ ছিল? কী কারণ ছিল এর পেছনে? তার কী বক্তব্য ছিল, যা তৎকালীন রাষ্ট্র এবং সমাজকে নিষিদ্ধ করতে হয়েছিল? সেটাকে নিষিদ্ধ করার কারণে সেই বক্তব্যের সাথে জনগণের সংযোগটিকে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল কি না, সেই বক্তব্যের যে প্রভাব, সেই বক্তব্যের যে প্রতিক্রিয়া, সেই বক্তব্যের মধ্যে যে বেগ এবং সেই বক্তব্যের মধ্যে যে অনুপ্রেরণা— তার থেকে কি জাতি, রাষ্ট্রশক্তি, ক্ষমতা ও জনগণকে আড়াল করতে পেরেছিল?
তিনি বলেন, এই বইয়ের পাঠক এবং এই বইয়ের নিবন্ধগুলোর মধ্য দিয়ে কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সত্য আবার আমাদের সামনে চলে আসবে। আমি মনে করি, সেই কারণেই বইটি শুধুমাত্র তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে নয়, এটি একটি মনোজগতকে ঘিরেও লেখা হয়েছে। সেই ফ্যাসিবাদী মনোজগত সম্পর্কে এই বইয়ে কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের ফ্যাসিবাদী মনোজগৎ ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে, যা কখনোই কোনো কাজে লাগে না।
মন্ত্রী বলেন, প্রকৃতি তার নিজের গতিতে চলে। স্রষ্টার আইন তার নিজের গতিতে চলে। জনগণের সম্মিলিত অনুভূতি তার নিজস্ব গতিতে চলে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো চক্রান্তের মাধ্যমে তাকে কেবলমাত্র কিছু সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করতে পারে। কিছু লোককে কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত করতে পারে। কিন্তু সব সময়ের জন্য সব লোককে বিভ্রান্ত করা যায় না এবং সব সময়ের জন্য কোনো সময়কে নিষিদ্ধভাবে বন্দী করা যায় না।
তিনি বলেন, ইমরুল কায়েসের এই বইয়ের উদ্বোধন করতে এসে আমি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাই। আবারো তিনি দেশের জন্য, জাতির জন্য যে ঝুঁকি নিয়েছেন, তিনি তার মা, তার পরিবার, তার সন্তান— সকলকে সাথে নিয়ে যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার এই ত্যাগের কারণেই জাতির মধ্যে যে পরিমাণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে, গণতন্ত্রের প্রতি স্পৃহা তৈরি হয়েছে, অনুপ্রেরণা তৈরি হয়েছে— সেই ধারাবাহিকতাতেই কিন্তু ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি যখন দেশের মাটিতে পা ফেলেছেন। তখন কোটি কোটি জনতা তাকে আবেগে গ্রহণ করেছে, নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে সবচেয়ে অবাধ জাতীয় নির্বাচনকে আদায় করেছেন এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো এমপি এবং সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন।
প্রকাশনা উৎসবে সভাপতিত্ব করেছেন বাংলাভিশন টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, অ্যাডভোকেট এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট নজমুল হক নান্নু, বিএফইউজে’র মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, মাতৃভাষা প্রকাশের প্রকাশক নেসার উদ্দীন আয়ূব।



