ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদলের দলের নেতৃত্ব দেয়া সাবেক মার্কিন কংগ্রেসম্যান ডেভিড ড্রেয়ার বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন প্রশংসনীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর ভোটের দিনটি ছিল বেশিভাগ ক্ষেত্রেই শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অগ্রগতি।
আইআরআই এক বিবৃতিতে জানায়, ৯ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল মোতায়েন করে ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করেছে।
ড্রেয়ার বলেন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অগ্রগতি।
আইআরআই প্রতিনিধিদলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ শাসনের অবসানের পর জটিল গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসরমান বাংলাদেশের জন্য এ নির্বাচন একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ’।
তিনি বলেন, নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখন সামনে রয়েছে দেশ পরিচালনার কঠিন কাজ এবং বাংলাদেশের জনগণের উদ্দীপনাকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন পরিচালনা কারিগরি দিক থেকে সুষ্ঠু হলেও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ এখনো নাজুক রয়ে গেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রার্থীদের আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়।
আইআরআইয়ের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী প্রাক-নির্বাচনী সময়কাল পূর্ববর্তী নির্বাচনের তুলনায় তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল, যদিও বিভিন্ন জেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের মধ্যে কিছু সংঘর্ষ ঘটে।
ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯ শতাংশ, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিশেষ করে ৩৫ বছরের নিচে অনেক তরুণ প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন। তবে নারীদের ভোটার তালিকায় ঐতিহাসিকভাবে কম গণনার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনকে জটিল জাতীয় কার্যক্রমের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি ও পেশাদারিত্বের কারণে প্রশংসা করা হয়েছে। কমিশনের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা পূর্ববর্তী নির্বাচনের তুলনায় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশীদের ডাকযোগে ভোটের সুযোগ, নাগরিক পর্যবেক্ষকদের স্বীকৃতির মানদণ্ড নির্ধারণ, এবং দেশব্যাপী ভোটার শিক্ষামূলক প্রচারণা-এসব সংস্কারকে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রাজনৈতিক দলের পোলিং অ্যাজেন্ট, নাগরিক পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বহু কেন্দ্রে উচ্চমাত্রার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে।
তবে প্রার্থীদের মধ্যে নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উল্লেখযোগ্যভাবে কম প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ভোটের দিন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যাপক বা পরিকল্পিত হামলার ঘটনা দেখা যায়নি। ভোটগ্রহণ সময়মতো শুরু হয়, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছিল, এবং কর্মকর্তারা পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ভোটকেন্দ্রগুলো নির্ধারিত সময়েই বন্ধ হয় এবং ভোট গণনা ও ফলাফল প্রদান প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কার্যকর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
নির্বাচন চলাকালে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। হাজারো ভোটকেন্দ্রকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। এসব পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং পরিস্থিতি অবনতির হাত থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছে।
বিশ্বব্যাপী ২৭০টিরও বেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের নেতৃত্ব বা সহায়তা প্রদানকারী আইআরআই নির্বাচন-পরবর্তী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবে এবং বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। বাসস



