অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দুদক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

‘গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে একটি লুটেরা অর্থনীতি ও ক্রনি ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল।’

সংসদ প্রতিবেদক

Location :

Dhaka City
অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দুদক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দুদক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর |নয়া দিগন্ত

জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সময়কার প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট, অর্থ পাচার এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়েও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।

রোববার (২৮ জুন) রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৭তম দিনে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান।

ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। দুই দফায় সময় বাড়ানোর পর প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে সংঘটিত অর্থনৈতিক অনিয়মের তীব্র সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে একটি লুটেরা অর্থনীতি ও ক্রনি ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মোট প্রায় ২৯ থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। তার ভাষায়, ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক ঋণ জালিয়াতি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক দখল এবং মেগা প্রকল্পের নামে ব্যয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো খাতে লেজিসলেটিভ ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে দুর্নীতিকে আইনি বৈধতা দেয়া হয়েছিল, যা অর্থনীতিকে কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

একই সঙ্গে তিনি ১৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ৭৩ শতাংশ বরাদ্দ রাজনৈতিক বিবেচনায় অপাত্রে যাওয়ার অভিযোগও তোলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন দিয়েছে, যেখানে বর্তমান সরকারের সময়েও সর্বোচ্চ দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যদিও প্রতিবেদনের কপি তার কাছে নেই, তবুও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি সংসদে মত দেন।

তিনি বলেন, ১৮ মাসের এই অস্থির সময়ে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এবং কারা জড়িত, তা দুদকের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত। তার মতে, বর্তমান সরকারের ভিত্তি স্বচ্ছতা, তাই যেকোনো অভিযোগেরই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট বৈশ্বিক মুদ্রা সংকট ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে, যাকে তিনি ‘এ বাজেট অফ নিউ ইকোনমিক অর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়েই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ ও আসল ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি দাবি করেন, বাজেটের দর্শন জনকল্যাণমুখী অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে ফ্রেডরিক বাস্টিয়া ও উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোনের চিন্তাধারার প্রতিফলন রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, টেকনাফের একজন দরিদ্র বিধবা নারীও যাতে এই বাজেটের সুফল পান, সেই লক্ষ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে নতুন কর আরোপ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক রূপান্তর।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন মডেল, নোবেলজয়ী জোসেফ স্টিগলিৎসের তত্ত্ব এবং সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের কৌশল তুলে ধরে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মাল্টিপোলার বিশ্বে বাংলাদেশকে নতুন সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বাজেটে রাষ্ট্র সংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাঁচটি মূল ভিত্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা করেন।