অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়িত বিভিন্ন কার্যক্রম

ফেস্টিবল ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করা হচ্ছে : সকল জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোকে সম্মান জানানো এবং উদযাপনের লক্ষে একটি সমন্বিত ফেস্টিবল ক্যালেন্ডার তৈরি করা হচ্ছে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় |সংগৃহীত

অন্তবর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোস্তফা সরায়ার ফারুকী। তার অধীনে মন্ত্রণালয় যেসব কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন তা হলো- বহু জাতি,বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতির দেশ বাংলাদেশ। এ বহুত্বকে উদযাপন এবং বহুত্বের পৃষ্ঠপোষকতা করার লক্ষ্যে একটি আধুনিক জাতীয় সংস্কৃতি নীতি প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট থেকে ‘কুইন্টিসেন্স অব নজরুল’ (নজরুল নির্যাস) শিরোনামে নজরুল সাহিত্য ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। এই গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে নজরুল সাহিত্যের বিশ্ব যাত্রা শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নজরুল সাহিত্য অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের আরো অনেক ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করবে। এর পাশাপাশি প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় নজরুলের গানের রক কনসার্ট-যা দেশের তরুণ সঙ্গীত পিপাসুদের কাছে দারুণ উপভোগ্য ছিল।

ফেস্টিবল ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করা হচ্ছে : সকল জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোকে সম্মান জানানো এবং উদযাপনের লক্ষে একটি সমন্বিত ফেস্টিবল ক্যালেন্ডার তৈরি করা হচ্ছে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব এবং দেশের সকল অঞ্চলের শিল্পের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখা কিংবদন্তি শিল্পীদের জন্ম ও মৃত্যু জয়ন্তী পালন।

একুশে পদক শুধু রাষ্ট্রীয় পদক বা একটি সম্মাননা নয়, এটা একইসাথে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দর্শনেরও প্রকাশ। নতুন বাংলাদেশের নতুন সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় বিগত দুই বছরে যে গুণিজনদের একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে, তাদের নামের তালিকা দেখলেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের নতুন পথযাত্রার রূপরেখা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। পাশাপাশি গত বছর থেকে স্বাধীনতা পদক প্রদানের ক্ষেত্রেও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। বদরুদ্দীন উমর, আবরার ফাহাদ, নভেরা আহমেদ এর মধ্যেই তার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ভোটের গাড়ি কাজ করেছে। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে সারাদেশে ভোটের আগ পর্যন্ত ঘুরেছে এসব ভোটের গাড়ি। এই প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে, গণভোট ও সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত ভিডিও, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক তথ্য ও প্রামাণ্যচিত্র, পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বার্তা।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ ও জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করা হয়। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক ‘জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ’ ও জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং ২৫টি রাজনৈতিক দল এতে স্বাক্ষর করে। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান দু’টি আয়োজন করেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

বাংলার লোক ঐতিহ্যের যাত্রাশিল্পকে ঘিরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩৫টি যাত্রাদলের অংশগ্রহণে ‘ত্রয়োদশ যাত্রা নিবন্ধন উৎসব-২০২৫’। উৎসবে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর জীবন ও যুদ্ধকালীন ভূমিকা অবলম্বনে যাত্রাপালার আয়োজন। আগামী মার্চে সারাদেশে এটা প্রচারিত হবে।

৬৪ জেলায় মহান বিজয় দিবস উদযাপন-২০২৫, অ্যাক্রোবেটিক শো, যাত্রাপালা, বিজয় দিবস কনসার্ট, ঢাকাসহ সারাদেশে একযোগে বিজয় মেলায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান আয়োজন।

শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে বছর জুড়ে ২৪টি সাধুসঙ্গ ও বিভিন্ন ভাবগানের আসরের আয়োজন করা হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে শিল্প সংস্কৃতির নানা মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং আরো প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর্ট রেস্টোরেশন প্রশিক্ষণ- ১৫ জন বাংলাদেশী শিল্পী চীনে তিন সপ্তাহ ব্যাপী রেস্টোরেশন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে দেশে ফিরেছেন।

ড্রোন ডিসপ্লে সারা পৃথিবীতে দ্রুত প্রসারমান একটি নিউ মিডিয়া। গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম থেকে শুরু করে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের সচেতনতামূলক কাজসহ সারা দুনিয়াতেই এর ব্যাপক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের নিউ মিডিয়া উৎসাহীদের এই নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার জন্য সম্প্রতি চীন সরকারের সহযোগিতায় চীনে একটি আবাসিক ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হয়েছে। মিউজিয়াম ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি দল দেশে ফিরে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে।

আগামী বছর থেকে বিকন হাউসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপ চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সাথে সাক্ষাতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার আলাপের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য আর্কিওলজিক্যাল সাইটগুলোকে ঘিরে সাংস্কৃতিক উৎসবের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। ছবিমেলা-বাংলাদেশ সরকার আয়োজিত প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবারের মতো এ মন্ত্রণালয় ছবিমেলার সঙ্গে পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয়ে ফটোগ্রাফি এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্ট ইভেন্টের সাথে যুক্ত থাকার বার্তা দিয়েছে। সেলিব্রেটিং বাংলাদেশী কালচার, হোম অ্যান্ড অ্যাবরোড এর আওতায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে ইউনেস্কো সদর দফতরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে একুশ, জুলাই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া চীন ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কও সম্প্রসারিত হয়েছে।

বাংলার আবহমান কালের ধারা অব্যাহত রাখার প্রত্যয়ে চর্যাপদ, মৈমনসিংহ গীতিকা, লালন, হাসন, শাহ আব্দুল করিমসহ নানা সময়ের ঐশ্বর্যের দিকে তাকালেই অনুধাবন করা যায় সঙ্গীত আমাদের সৃজনশীল প্রকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরতে ‘নদীপথে সুরভ্রমণ’ নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি অডিও ভিজ্যুয়াল প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এর আওতায় দেশের নানা অঞ্চলের নানা ধরনের গান এ সময়ের শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরা হবে। এই আয়োজন দেশের শ্রোতাদের পাশাপাশি বিশেষভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

দেশের সকল শিল্পকলা একাডেমিতে সংগীত শিক্ষা কার্যক্রমের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কাজ চলমান রয়েছে। দেশজুড়ে সঙ্গীত স্কুলগুলোকে বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে। বান্দরবান থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত সারাদেশে বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত সকল সঙ্গীত স্কুলকে সরকারের তরফ থেকে আর্থিক প্রণোদনার আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও বছর শেষে এই সংগীত স্কুলগুলোর মধ্যে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শ্রেষ্ঠ পাঁচটি স্কুলকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগও নেয়া হবে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।

এছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। নারীদের জুলাই, জুলাইয়ের নারীরা-এ বিষয়ে ২০২৪ এর মৃতপ্রায় আন্দোলনকে জীবিত করেছে জুলাইয়ের নারীরা। এই নারীদের সেলিব্রেট করার জন্য জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালার সূচনা করা হয় সেলিব্রেটিং জুলাই উইমেনস ডে দ্বারা। নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য জুলাই সনদে যুক্ত করা হয়েছে পর্যায়ক্রমে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিধান। জুলাই পুনর্জাগরণ নিয়ে নানা অনুষ্ঠানমালা করেছে। বাসস