নগর সংলাপে ডিএসসিসি প্রশাসক

জলাবদ্ধতা ও মশা নির্মূলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন?’ শীর্ষক নগর সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
বক্তব্য রাখছেন ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুস সালাম
বক্তব্য রাখছেন ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুস সালাম |নয়া দিগন্ত

রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও মশা নির্মূলে সব রাজনৈতিক দল এবং নগরবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যেখানে অন্তত সাত থেকে আটটি প্রধান ড্রেনেজ চ্যানেল থাকা দরকার, সেখানে রয়েছে মাত্র দুটি বা তিনটি। এতে করে বৃষ্টি হলেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। এমনটাই জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুস সালাম।

শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন?’ শীর্ষক নগর সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘রাজধানীর বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তন করে একটি মানসম্মত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের চিন্তা করতে হবে। একইসাথে নাগরিকদেরও সমষ্টিগত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় দিয়ে দেখতে হবে সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে কি না।’

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও ঢাকার শৃঙ্খলা ফেরাতে সব রাজনৈতিক দলকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

প্রশাসক জানান, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মশা ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার দাবি, প্রায় ৯৯ শতাংশ মশার জন্ম হয় জলাবদ্ধতা থেকে। তাই জলাবদ্ধতা দূর করতে পারলে ডেঙ্গুর প্রকোপও কমানো সম্ভব হবে।

তিনি জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রথমবারের মতো প্রাক-বর্ষা মশার লার্ভা নিধনে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আওতায় ৩৬ জন মাঠকর্মী প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালাচ্ছেন। মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে লার্ভার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করা হবে।

তিনি জানান, এখন থেকে রাজধানীতে কোনো হকার বা রিকশা নিবন্ধনের বাইরে থাকতে পারবে না। কোথায় কতজন হকার বসতে পারবেন, তারও সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, ‘৫৪ বছর আগে ঢাকা শহরে প্রায় ৫০টি প্রাকৃতিক খাল ও লেক ছিল। এখন কতটি আছে, তা সবাই জানেন। একক কোনো সংস্থার পক্ষে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সারা বছরই ঢাকার বিভিন্ন সড়ক কখনো বিদ্যুৎ, কখনো গ্যাস, আবার কখনো পানির লাইনের জন্য খোঁড়া হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে এবং জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হচ্ছে।’

পাশাপাশি এক শহরকে দুই সিটি করপোরেশনে ভাগ করাও ব্যবস্থাপনার বড় সমস্যা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও মশা গবেষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার তার গবেষণাপত্রে বলেন, বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় জমে থাকা পানিতে ৬৪ শতাংশ মশার জন্ম হয়। জলাবদ্ধতা ও মশার সমস্যা সমাধানে নগরবাসীকেও দায়িত্ব নিতে হবে। নিজ নিজ বাসা ও আঙিনা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ঢাকার মোট মশার প্রায় ৯৯ শতাংশই জলাবদ্ধতার সাথে সম্পর্কিত। ঢাকায় এক ঘণ্টায় একজন মানুষকে ৮৫০টি মশা কামড়াতে পারে।

মশা নিয়ন্ত্রণে তিনি সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ড্রেনে গাপ্পি মাছ ছাড়া এবং পরিবেশবান্ধব বিটিআই ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো: নূরুল্লাহ। তার প্রস্তাবনায় বলা হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার জন্য দ্রুত ড্রেনেজ সার্কেলের জনবল কাঠামো অনুমোদন করে কার্যক্রম চালু করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার অবসরপ্রাপ্ত ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক হিসেবে সিটি করপোরেশনে যুক্ত করার প্রস্তাবও দেয়া হয়।

এছাড়া ঢাকা ওয়াসার বিদ্যমান স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান অনুসরণ, সমন্বিত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং ওয়ার্ড ও ব্লকভিত্তিক নাগরিক কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়।

সংগঠনের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমনের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি এ কে এম শহিদ উদ্দিন, বায়ুমণ্ডলী দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, স্থপতি খালিদ মাহমুদ শাহীন প্রমুখ।