জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ কমিশনকে মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে উল্লেখ করে এটি অপরিবর্তিত রেখেই সংসদে পাস করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সোমবার (৯ মার্চ) দুপুরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সম্মেলনকক্ষে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে নবনিযুক্ত কমিশনারদের এক মতবিনিময় সভায় এ আহ্বান জানানো হয়।
সভায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ কমিশনকে মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত এখতিয়ার দিয়েছে। তাই এটি অপরিবর্তিত রেখেই আইনে পরিণত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনের ওপর নাগরিক সমাজের আস্থা রয়েছে এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় নাগরিক সমাজ কমিশনের পাশে থাকবে। নারী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কমিশনকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। একইসাথে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার নিশ্চিত করতে কমিশনের একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মকৌশল প্রণয়নের পরামর্শ দেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান কমিশনারদের সাথে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাদের ব্যক্তিগত সততা ও দক্ষতা নিয়ে নাগরিক সমাজ গর্ববোধ করে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কমিশন শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজ করবে।
তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি হুবহু আইনে পরিণত হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা সম্ভব। এজন্য নবনির্বাচিত সরকারকে বর্তমান অধ্যাদেশ ও কমিশনারদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ন্যায়পাল নিয়োগ এবং বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবির বলেন, নাগরিক সংগঠনগুলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাথে একত্রে কাজ করতে চায়। বর্তমান অধ্যাদেশের আলোকে একটি শক্তিশালী মানবাধিকার আইন প্রণয়নে সংগঠনগুলো তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ‘বি’ স্ট্যাটাস থেকে ‘এ’ স্ট্যাটাসে উন্নীত হওয়ার জন্যও সংগঠনগুলো কমিশনকে সহযোগিতা করবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন এখনও ‘বি’ স্ট্যাটাসে রয়েছে, যা দুঃখজনক। ‘এ’ স্ট্যাটাস অর্জন করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, অধ্যাদেশে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটি অবিকৃতভাবে সংসদে পাস হওয়া উচিত। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরো সক্রিয় ও কার্যকরভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান কমিশনারদের অতীত কাজ, ব্যক্তিগত অবস্থান ও জনজীবনে তাদের ভূমিকা প্রমাণ করে যে, আইন যতদূর অনুমতি দেবে কমিশন ততদূর পর্যন্ত আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সাহসের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে কমিশন নিষ্ক্রিয় থাকতে চায় না, বরং সহায়ক, কার্যকর এবং মানুষের আস্থার জায়গা হতে চায়। একটি কার্যকর, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য মানবাধিকার কমিশন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ নয়, এটি পুরো রাষ্ট্র ও নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নের সাথে জড়িত।
তিনি আরো বলেন, নতুন বাংলাদেশের এই সময়ে যদি একটি শক্তিশালী আইন, স্বাধীন কাঠামো এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশ অচিরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘এ’ স্ট্যাটাস অর্জন করতে সক্ষম হবে।
মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারী নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন এবং মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে কমিশনের কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন মতামত ও সুপারিশ প্রদান করেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন কমিশনার ড. নাবিলা ইদ্রিস।
এ সময় কমিশনের অন্যান্য সদস্য মো: নূর খান, অধ্যাপক মো: শরীফুল ইসলাম এবং ইলিরা দেওয়ান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, আদিবাসী অধিকারকর্মী দিপায়ন খীসা, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উপদেষ্টা মাবরুক মোহাম্মদ, কাপেং ফাউন্ডেশনের ফাল্গুনী ত্রিপুরা, এএলআরডির কর্মসূচি ব্যবস্থাপক অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদ সিরাজী এবং স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্তসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বাসস



