গত আট দশকে ঢাকা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ২৬টি খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। দখল, ভরাট কিংবা বক্স কালভার্টের নিচে চাপা পড়ে এসব খাল এখন মৃতপ্রায় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার মূল কারণ কেবল বৃষ্টি নয়; বরং অপরিকল্পিত ও বর্ধিত নগরায়ণও এর অন্যতম কারণ।
নগর গবেষক খন্দকার গোলাম তাওহিদের মতে, একসময় ঢাকায় প্রায় ৫২টি খাল ছিল, যা শহরের প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করত।
তবে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক ভূমির নকশার সাথে ২০২২ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করে দেখা গেছে, গত আট দশকে ঢাকা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ২৬টি খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। দখল, ভরাট কিংবা বক্স কালভার্টের নিচে চাপা পড়ে এসব খাল এখন মৃতপ্রায়।
রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যেই ঢাকা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একর বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ও জলাশয় হারিয়েছে। রাজউকের আওতাধীন এলাকায় থাকা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ পুকুরের মধ্যে মধ্য ঢাকা অঞ্চলে মাত্র ২৩৫টি পুকুর টিকে আছে।
বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, একটি নগরের মোট আয়তনের অন্তত ১২ শতাংশ জলাধার থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকায় এখন এর পরিমাণ ২ শতাংশেরও কম।
কর্তৃপক্ষ ২০২৩ সালের বর্ষা মৌসুমের আগেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০৮টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৩টিসহ মোট ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করেছে।
খন্দকার গোলাম তাওহিদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগী মনে করেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ।
ঢাকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করে। এর মধ্যে মিরপুরের কাজীপাড়া, সেনপাড়া, বাসাবো, খিলগাঁও, বাড্ডা, পোস্তগোলা ও ডেমরার মতো নিচু এলাকাগুলোকে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলে ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত পানি জমে থাকা এখন স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে বিদ্যমান ড্রেনেজ চ্যানেলগুলো কোনো বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কিং ছাড়াই বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি করা হয়েছে। খাল, জলাশয় ও রিটেনশন পন্ডের জন্য চিহ্নিত জায়গাগুলো ভরাট ও দূষিত হওয়ার কারণে শহরের প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
বক্তারা ঢাকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো উদ্ধার এবং একটি সমন্বিত বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।
তাদের মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ঢাকাকে পুনরায় বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।



