ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বেশি দেখা যায়। এ সময়ে এডিস মশার প্রজননও বাড়ে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আরো জোরদার করতে আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্ন অভিযান-২০২৬’এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী গত পরশু ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের মহাপরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গুর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে এডিস মশার লার্ভা যাতে জন্মাতে না পারে এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত পরশুদিন পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, চিকিৎসা নিয়েছেন অথবা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মীর শাহে আলম বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী তিন মাস দেশব্যাপী এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হবে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি শনিবার সারাদেশে একযোগে এ কার্যক্রম চালানো হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে নগর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হবে।
তিনি বলেন, এ কর্মসূচিতে স্কাউটস, বিএনসিসি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক, রেড ক্রিসেন্ট, রোভার, বিডি ক্লিন এবং দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অংশ নেবেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, একই সময়ে দেশের ৬৪টি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এবং ৫০৩টি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। জাতীয় পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী বক্তব্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে। এরপর সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বেচ্ছাসেবক ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেবেন।
তিনি বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে এ কর্মসূচিকে সফল করতে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউটসসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, জাতীয় পর্যায়ের কমিটিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামকে আহ্বায়ক এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিতে তথ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, বিএনসিসির মহাপরিচালক, রেড ক্রিসেন্টের মহাসচিব, স্কাউটসের নির্বাহী পরিচালক এবং দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারাও রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সাত্তারকে এ কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছে।
মীর শাহে আলম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতে তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য অধিদফতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জাতীয়, জেলা ও মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে ডেঙ্গু ও এডিস মশা প্রতিরোধে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি ভিডিও প্রতি ঘণ্টায় দুই থেকে তিনবার প্রদর্শন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতি শনিবারের পরিচ্ছন্নতা অভিযানে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বয় করে নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচন করবে। এসব স্থানের মধ্যে থাকতে পারে ড্রেন, পানি জমে থাকা স্থান, কচুরি পানায় ভরা পুকুর, খাল, খেলার মাঠ, আবাসিক এলাকা কিংবা যানবাহন চলাচলের ব্যস্ত স্থান। এডিস মশার প্রজননের সম্ভাবনা রয়েছে, এমন সব স্থান পরিষ্কার করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতি শনিবার দেশের সব কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেবেন। স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করবে।
তিনি জানান, কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় কমিটি পরদিন একটি সভা করবে। সভায় সারাদেশে অভিযান পরিচালনার বিভিন্ন দিক, দায়িত্ব বণ্টন এবং সমন্বয়ের বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হবে।
মীর শাহে আলম বলেন, আগামী ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্ন অভিযান ২০২৬’-এর উদ্বোধন করবেন। এ সময় দেশের ৬৪টি জেলা ও ৫০৩টি উপজেলা থেকে জুম ও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা যুক্ত থাকবেন।
তিনি বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হবে। তারা সকাল থেকে দিনব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করবেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাড়ির ভেতরে ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা অন্য কোনো স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে কি না, এসব বিষয়ে প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিন মাসব্যাপী এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের সর্বত্র পরিচ্ছন্নতার একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম গড়ে তোলা হবে।
মীর শাহে আলম বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল হতে হলে শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেয়া যথেষ্ট নয়। আগে থেকেই পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সূত্র : বাসস



