জাতীয় ফল মেলায় চাষি কম, আধিক্য ‘ফল ভান্ডার ও বিতানের’

৫৪ বছরে ফলের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪২ লাখ টন : কৃষিমন্ত্রী

বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কেআইবি চত্বরে তিন দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ।

নিজস্ব প্রতিবেদক
মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ
মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ |নয়া দিগন্ত

দেশীয় ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি, বিলুপ্তপ্রায় ও অপ্রচলিত ফলের প্রচার এবং ফল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলা-২০২৬। তবে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকার এই আয়োজন ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে এর কার্যকারিতা নিয়ে। মেলা ঘুরে দেখা গেছে, দেশীয় ও অপ্রচলিত ফলের পরিবর্তে অধিকাংশ স্টলই দখল করে নিয়েছেন রাজধানীর স্থানীয় ফল ব্যবসায়ীরা।

মেলাজুড়ে আমের আধিক্য, সাধারণ ফলের বাজারের মতোই বিক্রিব্যবস্থা এবং তুলনামূলক বেশি দাম দর্শনার্থীদের হতাশ করেছে। অনেকের অভিযোগ, জাতীয় ফল মেলা হলেও এটি যেন রাজধানীর বিভিন্ন ‘ফল ভান্ডার’ ও ‘ফল বিতান’র অস্থায়ী বাজারে পরিণত হয়েছে।

‘করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করবো বারো মাস’ প্রতিপাদ্যে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে তিন দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। আগামী শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং কৃষি তথ্য সার্ভিস যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পর্যায়সহ দেশব্যাপী এ আয়োজনের জন্য প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রচার ও প্রকাশনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং বিএআরসি মিলনায়তনে সেমিনার আয়োজনের জন্য ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা। এছাড়া জেলা পর্যায়ে প্রতি জেলায় ২৫ হাজার টাকা এবং উপজেলা পর্যায়ে ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাকি অর্থ জাতীয় পর্যায়ের আয়োজন ও অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে।

এবারের মেলায় মোট ৭৫টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি সরকারি এবং ৬৭টি বেসরকারি। তবে মেলা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বেসরকারি স্টলই রাজধানীর ফার্মগেট, কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, পুরানা পল্টন, ইন্দিরা রোড, ৬০ ফিটসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিষ্ঠিত ফল ব্যবসায়ীদের দখলে।

একাধিক দর্শনার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ফল মেলার প্রবেশ মুখটা খুবই নান্দনিকভাবে সাজানো হয়েছে। মূল গেট পার হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বড় স্টল। ডানে কৃষি তথ্য সার্ভিস ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) স্টল। আর বামে বিএডিসির সুন্দর স্টল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের স্টলের পরেই হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের স্টল। তার পর থেকেই দুই সাইটে বেসরকারি স্টলগুলো বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। যেগুলোর নামের শেষে ‘ফল বিতান ও ফল ভান্ডার’ রয়েছে। ফল মেলায় দেশের ফলচাষী বা উৎপাদক, রফতানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রাধান্য থাকার কথা থাকলেও আগের মতোই ফল ব্যবসায়ীদের আধিক্য রয়েছে বলে অভিযোগ। এসব স্টল মূলত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা ফল ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান বলে জানা যায়।

ফার্মগেটের ‘সৌরভ ফল বিতান’ ও পুরানা পল্টনের ‘ইয়াছিন ট্রেডিং’র মতো প্রতিষ্ঠানের স্টল রয়েছে মেলায়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, দোকানে যে ফল বিক্রি করেন, মেলাতেও সেই একই ফল এনেছেন। তবে মেলায় সেগুলো তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা যাচ্ছে। ইন্দিরা রোডের ব্যবসায়ী সুমন ‘সুমন ফল ভান্ডার’ ও ‘রুবেল আরিয়ান ফল ভান্ডার’ নামে দুটি স্টলের বরাদ্দ পেয়েছেন। একই এলাকার ‘মেসার্স করিমগঞ্জ ফল বিতান’ও স্টল পেয়েছে।

মেলায় ঘুরে দেখা যায়, আম, জাম, কাঁঠাল, ড্রাগন ফল ও আনারস ছাড়া খুব বেশি বৈচিত্র্যময় ফলের উপস্থিতি নেই। বিলুপ্তপ্রায় কিংবা অপ্রচলিত দেশীয় ফলের সংগ্রহও ছিল সীমিত। বিশেষ করে মেলাজুড়ে আমের প্রাধান্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন স্টলে রাজধানীর সাধারণ ফলের বাজারের মতো করেই আম বিক্রি হতে দেখা যায়। এসব আমের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন দর্শনার্থী।

মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রাকিব হাসান বলেন, ‘প্রতিবছরই ফল মেলায় আসি। এবার সাধারণ বাজারে যেসব ফল পাওয়া যায়, সেগুলোই বেশি দেখা যাচ্ছে। বাজারের মতোই মান হলেও মেলা হিসেবে বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, ‘দেশে গত ৫৪ বছরে ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৭০ সালে দেশে যেখানে ১৭ লাখ টন ফল উৎপাদিত হতো, সেখানে কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে উৎপাদন বেড়ে ৫৯ লাখ টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ গত ৫৪ বছরে ফলের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪২ লাখ টন।’

ফলের বহুমুখী ব্যবহার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার কাঁঠালের বিকল্প ব্যবহার নিয়ে কাজ করছে। কাঁঠাল দিয়ে সিঙ্গাড়া, সমুচা ও বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরি করা হচ্ছে। কাঁঠালের কাবাব ও সবজিও খাদ্যমূল্যের দিক থেকে সমৃদ্ধ। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের কাঁঠাল ব্যবহার করে এ ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’

একই দিন খামারবাড়ির বিএআরসি মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘দেশীয় ফল ডেউয়া প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামাঞ্চলে এটি ব্যাপকভাবে খাওয়া হলেও বর্তমানে এর প্রচলন অনেক কমে গেছে।’ এতে প্রচুর বিচি থাকায় গবেষণার মাধ্যমে লেবুর মতো বিচি কমিয়ে উন্নত জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম।