প্রজ্ঞার কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক কম

‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ সংশোধন করে নিবন্ধনের আইনি দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেয়া হলে এই লক্ষ্য অর্জন দ্রুততর হবে। এখনো বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ কোটি শিশু অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে। যা দুঃখজনক। আইনের বেশিকিছু কাঠামোগত দুর্বলতা নিবন্ধন কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাচ্ছে না।

বিশেষ সংবাদদাতা
প্রজ্ঞা আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন : অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালা
প্রজ্ঞা আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন : অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালা |নয়া দিগন্ত

শিশুদের জন্ম নিবন্ধন শতভাগ নিশ্চিত করতে এবং মৃত্যু নিবন্ধনকে কার্যকর করতে দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে দায়িত্ব দেয়া উচিত। কারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উত্তরাধিকার এবং ভোটাধিকারের মতো মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, সুশাসন এবং বাজেট প্রণয়নেও নিবন্ধন তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিমতে জানান বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন হার যথাক্রমে ৫০ শতাংশ ও ৪৭ শতাংশ। যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড় হারের তুলনায় অনেক কম। অথচ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার শতভাগে উন্নীত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ সংশোধন করে নিবন্ধনের আইনি দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেয়া হলে এই লক্ষ্য অর্জন দ্রুততর হবে। এখনো বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ কোটি শিশু অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে। যা দুঃখজনক। আইনের বেশিকিছু কাঠামোগত দুর্বলতা নিবন্ধন কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাচ্ছে না।

বুধবার (৮ জুলাই) রাজধানীর বিএমএ ভবনে ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন : অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব বিষয় তুলে ধরেন বক্তারা। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) এর সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এ কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ার ৩০ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রজ্ঞা’র কোঅর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন। কর্মশালায় আলোচক হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের।

কর্মশালায় উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়, বর্তমান আইনে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য দেয়ার মূল দায়িত্ব কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের নয়। তবে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়া হলে এগুলোর আওতায় জন্ম নেয়া দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুকে সহজেই নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বহু দেশ এ পদ্ধতি অনুসরণ করেই শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য পূরণ করেছে।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক চিত্র :

অনুবিশ্বজুড়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের হার ছিল ৬০ শতাংশ। যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ শতাংশে। তবে, এখনো বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ কোটি শিশু অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে। যা দুঃখজনক। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডে প্রায় শতভাগ শিশু জন্ম নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। ইউএনএসকাপ-এর তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও গত এক দশকে জন্ম নিবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১২ সালে যেখানে পাঁচ বছরের নিচে অনিবন্ধিত শিশুর সংখ্যা ছিল ১৩.৫ কোটি। বর্তমানে তা কমে ৫.১ কোটিতে নেমে এসেছে। তারপরও এখনো প্রতি বছর প্রায় ১.৪ কোটি শিশু জন্মের এক বছরের মধ্যে নিবন্ধিত হয় না। যা হতাশাজনক।

অন্যদিকে, মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় হার ৭৪ শতাংশে (২০২৩ সালে) পৌঁছেছে। এই অগ্রগতি ইতিবাচক, তবে এখনো প্রতিবছর প্রায় ৬৯ লাখ মৃত্যুর তথ্য রেকর্ডবহির্ভূত থেকে যায়। যার বেশিরভাগ ঘটে নিজ বাড়িতে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের আওতার বাইরে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জন্ম নিবন্ধনে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। ২০০৮ সালে এই অঞ্চলে জন্ম নিবন্ধনের গড় হার ছিল মাত্র ৩৯ শতাংশ। যা ২০২৪ সালে দ্বিগুণ হয়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে। মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় জন্ম নিবন্ধনের হার প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে, ভারত ৮৯.১ শতাংশ, নেপাল ৭৭ শতাংশ এবং মিয়ানমার ৮১.৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে বাংলাদেশের চিত্র

এক তথ্যে জানা গেছে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য, তবে সন্তোষজনক নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধনের হার ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অগ্রগতির তুলনায় অনেক কম। তবে সঠিকভাবে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার দেড়শত বছরের পুরানো আইন বাতিল করে ২০০৪ সালে ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন’ প্রণয়ন করেছে, যা ২০০৬ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে, ২০১৩ সালে এটি সংশোধিত হয় এবং ২০১৬ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিষয়ক রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে আইনগতভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব প্রদানের কোনো বিকল্প নেই।

ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস-এর কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো: নজরুল ইসলাম বলেন, আইন শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জনবল সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আন্তঃখাত সমন্বয়হীনতা দূর করা বিশেষভাবে জরুরি।

ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ’র হেড অব অনলাইন (বাংলা) মো: মনির হোসেন লিটন বলেন, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও জনভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করতে হবে, যা নীতি পরিবর্তনে ইতিবাচক চাপ তৈরি করবে।