স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। একইসাথে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের আওতায় আনতেও সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘আইনমন্ত্রী ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছেন, শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে ধারাবাহিকভাবে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে।’
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সংসদে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ প্রসঙ্গে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী গণহত্যা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
রংপুর-৪ আসনের এনসিপি দলীয় সদস্য আখতার হোসেন ৬৮ বিধিতে সংসদে নোটিশটি উত্থাপন করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দল হিসেবে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ-সংক্রান্ত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী ও লজিস্টিক সহায়তা আরো বাড়ানো হবে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের সব মামলার বিচার সম্পন্ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর। একইসাথে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনোভাবেই যাতে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য বজায় রেখে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করা হবে।
আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, শেখ হাসিনা আইনের দৃষ্টিতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাই বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করলেই আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেফতার করা হবে।’
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি স্বীকৃত সত্য এবং সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম মাইলফলক।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জুলাই হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ১২টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে এবং চারটি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তিনি জানান, সরকারের আমলে ইতোমধ্যে তিনটি মামলার রায় হয়েছে, যার মধ্যে আবু সাঈদ হত্যা মামলাও রয়েছে। এছাড়া শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংগঠন হিসেবে তদন্ত এবং জেলা পর্যায়ের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া ৫৯০টি অভিযোগের মধ্যে ১০৯টি মামলা বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ৪৩টি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন, ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। আরো ২৬টি মামলা বিচারাধীন এবং চারটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও পঙ্গু যোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে সরকারকে আরো কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের নতুন বাংলাদেশ, তাদের কখনোই ভুলে যাওয়া যাবে না। তিনি জুলাই জাদুঘর দ্রুত উদ্বোধন এবং জুলাই ফাউন্ডেশনকে আরো কার্যকর ও প্রাণবন্ত করারও আহ্বান জানান।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল দীর্ঘ আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। এ আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি করা উচিত নয়।
তিনি জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্পন্ন, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা এবং জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে দেশ গঠনে সব রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান ও আত্মত্যাগ যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেয়া এবং দিনটিকে স্মরণে রাখার উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে উল্লেখ করে বিরোধীদলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানো, দক্ষ প্রসিকিউটর ও বিচারক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। একইসাথে তিনি আওয়ামী লীগের বিচার, মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া আরো গতিশীল করার আহ্বান জানান।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, ঢাকা-১৪ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম, সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪৫ এর বিরোধীদলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য ও শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম আলোচনায় অংশ নেন। বাসস



