বাসযোগ্যতায় ঢাকা এগিয়ে যাচ্ছে নিম্নতম পর্যায়ে

পরিবহন, বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অভাবে ঢাকা ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিআইপি আয়োজিত ‘ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা : চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পিত সমাধানের পথরেখা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন নেতৃবৃন্দ
বিআইপি আয়োজিত ‘ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা : চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পিত সমাধানের পথরেখা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন নেতৃবৃন্দ |সংগৃহীত

বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকা নিম্নতম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে নগরের বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত ‘ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা : চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পিত সমাধানের পথরেখা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন নেতৃবৃন্দ ঢাকাকে এভাবেই চিহ্নিত করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। পরিবহন, বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অভাবে ঢাকা ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। একসময় ঢাকায় প্রায় ৫৬টি খাল থাকলেও বর্তমানে ২৬টি খালের কোনো অস্তিত্বই নেই। পাশাপাশি ঢাকা শহরের ৪৮টি এলাকা জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাধার দখল ও দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এর অন্যতম কারণ।’

বায়ু, শব্দ ও আলোকদূষণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও আলোকসজ্জা নগরের নান্দনিকতা, পরিবেশ ও সড়ককে নিরাপত্তাহীন করে তুলছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত ভবনঘনত্ব, জলাবদ্ধতা ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।’

সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ তিনি বলেন, ‘৯৯.২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাত্র ৭.৯৯ শতাংশ সবুজ এলাকা রয়েছে। বাসযোগ্য শহরের জন্য এটা একেবারেই অপর্যাপ্ত।’

পরিবহন সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যানজটে ঢাকায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, এতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে।’

বিআইপি সভাপতি বলেন, ‘ঢাকার তৈরি বর্জ্যের ২৭ শতাংশ (প্রায় এক হাজার ৭৬৫ টন) রাস্তায় পড়ে থেকে জলাবদ্ধতা ও মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে।’

‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করে পুনর্ব্যবহার করে এবং তা থেকে শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ভূমিকা রাখা যায়,’ বলেন তিনি।

তিনি বিআইপি’র পক্ষ থেকে ৭টি সুপারিশ তুলে ধরেন। এগুলো হলো- রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তন হলেও চলমান পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা; ব্যক্তিস্বার্থে অনুমোদিত পরিকল্পনার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে না; মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে প্রতি পাঁচ বছর পরপর পরিকল্পনাবিদ, বিশেষজ্ঞ, সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনার অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করতে হবে; খণ্ডিত এলাকাভিত্তিক, একক খাতভিত্তিক বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, পরিবেশ, আবাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে একীভূত করে সমন্বিত জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে; অনুমোদিত পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য নিশ্চিত না করে জলাভূমি, কৃষিজমি বা অন্যান্য পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না।

পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গত ছয় মাসে নগরের বাসযোগ্যতা উন্নয়নে সরকার কার্যকর ও দৃশ্যমানভাবে কতটুকু উদ্যোগ নিয়েছে এর মূল্যায়ন প্রয়োজন।’

তিনি ঢাকার ফুটপাত দখল, অবৈধ ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং নগর ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

খাল খনন কর্মসূচির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও প্রথমে খালগুলো কারা দখল করেছে এবং কীভাবে দখল হয়েছে তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।’

পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, ‘গাজীপুর-ঢাকা বিআরটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন এবং ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় আরো কিছু বিআরটি রুট সংযোজন করা যেতে পারে।’

তিনি অন্যান্য শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, ‘বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট কিন্তু জরুরি নগর সমস্যাগুলো সমাধানে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।’