দুর্নীতির কার্যকর ও দৃশ্যমান প্রতিরোধ ছাড়া সরকারের কোনো অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এক্ষেত্রে বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখা, নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদের আলোকে সরকারের সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত কৌশল ও পথরেখা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নযোগ্য সকল কর্মপরিকল্পনার মূলধারায় অবশ্য পালনীয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সরকারের সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ কৌশলগত প্রাধান্য : টিআইবির সুপারিশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়।
একইসাথে বিএনপির অভ্যন্তরে সরকারের সাফল্যের পরিপন্থী শক্তি যেন ক্রমান্বয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য সুচিন্তিত কৌশল অবলম্বনসহ সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের জন্য আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে একটি জনপ্রতিনিধি আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করারও আহ্বান জানায় টিআইবি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাজী আমিনুল হাসান। সুপারিশমালা উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো: জুলকারনাইন।
দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সুশাসিত ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে, তার বাস্তবায়নের জন্য অনতিবিলম্বে বিএনপির রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখা ও নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদের ওপর ভিত্তি করে একটি সমন্বিত কৌশল ও পথরেখা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নযোগ্য সকল কর্মপরিকল্পনার মূলধারায় সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী উপাদান সক্রিয়ভাবে ও অবশ্য পালনীয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে দুদক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশমালার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন বিশেষত, দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫ এর বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দূর করে কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার পথ সুগম করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। একইসাথে, দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অবস্থান ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সরকারের বিশাল সুযোগ ও সক্ষমতার পাশাপাশি বহুমুখী প্রতিকূলতা ও ঝুঁকির সূত্র, স্বরূপ ও প্রক্রিয়া চিহ্নিত করে, তা মোকাবেলার কৌশল অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের, আমলাতন্ত্রের ও ব্যবসায়ীসহ প্রায় সকল পেশাজীবীদের অনেকের মধ্যেই দৃশ্যমান ‘এবার আমাদের পালা’- সংস্কৃতির বিকাশ রোধে দল ও দলীয় অঙ্গসংগঠনসহ দলীয় আনুগত্যপুষ্ট সকল ক্ষেত্রে শুদ্ধতা চর্চা নিশ্চিতে দল ও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতার দিকনির্দেশনাসহ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিএনপির অভ্যন্তরেই বিএনপি সরকারের সাফল্যের পরিপন্থী শক্তি যেন ক্রমান্বয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য সুচিন্তিত কৌশল অবলম্বন করতে হবে।’
দুর্নীতিবিরোধী প্রত্যয় বাস্তবায়নে অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে জুলাই সনদের সম্পূর্ণ দ্বিমতহীন ৭৪ ধারা অনুযায়ী সকল জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে নিজ ও পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয় ও সম্পদ বিবরণী বাৎসরিক ভিত্তিতে হালনাগাদ করার বাধ্যবাধকতাসহ অনতিবিলম্বে ওয়েবসাইটে প্রকাশের চর্চা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ চর্চা সকল খাত ও পর্যায়ের সরকারি কর্মচারী ও অন্যান্য জনবল যাদের বেতন-ভাতা রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করা হয়, তাদের সকলের জন্য প্রযোজ্য করাসহ জুলাই সনদে বর্ণিত সকল রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মত প্রস্তাবনা অনুযায়ী সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার অবৈধ ঘোষণা করতে হবে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশেষ করে স্বার্থের সংঘাতমুক্ত ভূমিকা পালন নিশ্চিতের স্বার্থে নবনিযুক্ত গভর্নরের নিয়োগ বাতিল করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট খাতে পরীক্ষিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং সর্বোপরি গভর্নরের দায়িত্বের আওতাভুক্ত সকল বিষয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে ভূমিকা পালনে সক্ষম এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদানের আহ্বান জানাচ্ছি।’
টিআইবি দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক সুপারিশে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার বাছাই কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি মনোনয়নের এখতিয়ার বিরোধী দলের নেতার হাতে দেয়া, কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিতে পর্যালোচনা কমিটি গঠন, দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি মোকাবেলায় স্বতন্ত্র ইন্টিগ্রিটি ইউনিট গঠন এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থেকে মামলা পরিচালনা পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে। একইসাথে বেসরকারি খাতের ঘুষ-দুর্নীতিকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে আইনের আওতায় আনা, অর্থপাচার বন্ধে বিএফআইইউ, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মালিকানা স্বচ্ছতা আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিষয়ক সুপারিশে টিআইবি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন পুলিশ কমিশন আইন প্রণয়ন এবং সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলাসহ আইন-শৃঙ্খলাবিরোধী সকল তৎপরতা মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে। একইসাথে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিদ্যমান ঘাটতিগুলো সংশোধন করে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও গোপনীয়তা সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারের অন্যান্য কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির জন্য টিআইবির উপস্থাপিত সুপারিশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রণীত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে কোনগুলো কোন যুক্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে বা হবে না তা স্বচ্ছতার স্বার্থে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রকাশ করা; কালো টাকা বৈধ করার চর্চা স্থায়ীভাবে বাতিল করা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো প্রণয়নে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; কর্তৃত্ববাদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, চাঁদাবাজি এবং আর্থিক খাতসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেমন ডিজিএফআই, এসবি, ডিবি, এনএসআই ইত্যাদি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ এবং র্যাব বিলুপ্ত করা; সকল সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা ও এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগে দলীয়করণ বন্ধ করা; রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে সব সরকারি, আধা-সরকারি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা; সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেকোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বন্ধ করা; বিদ্যমান দলীয় লেজুড়বৃত্তিক সকল পেশাজীবী, বিশেষায়িত ও সেবাখাতভিত্তিক সংগঠন-সমিতি বিলুপ্ত করে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় দলীয় প্রভাবমুক্ত সংগঠন-সমিতি প্রতিষ্ঠা করা; বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ‘মব’ তৈরি করে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অপসারণের চর্চা কঠোরভাবে প্রতিহত করা; স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, জনবান্ধব, দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত, এবং সাম্য ও ন্যায়বিচারভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা; সকল প্রকার সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘‘ভ্যালু ফর মানি’’ অর্জনে অন্তরায় ও অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে এমন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাসমূহ চিহ্নিত ও সংস্কার করা; বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও স্বকীয়তা বজায় রেখে মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীলতা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি ও পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র ডাইভারসিটি (বৈচিত্র্য) কমিশন গঠন করা; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর ওপর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা ও দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি দক্ষ প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; ব্যাংক খাত, বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ক্ষেত্রে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করা; জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বন্ধ ও জ্বালানি মিশ্রণে নবানয়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং পরিবেশ-সংবেদনশীল এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর এবং পরিবেশ দূষণকারী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ না করা। প্রেস বিজ্ঞপ্তি



