দেশে সার সঙ্কট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলেছেন, গুদামে সার থাকার সরকারি হিসাব দিয়ে কৃষকের দুর্ভোগ আড়াল করা যাবে না। সার মজুদ থাকলেও কৃষকের হাতে তা সময়মতো পৌঁছছে না। কালোবাজারি, মজুদদারি, ডিলার সিন্ডিকেট ও দুর্বল বিতরণব্যবস্থার কারণে কৃষককে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, এটি সারের ঘাটতির চেয়ে বেশি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমন পরবর্তী রবি ও বোরো মৌসুমে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। অক্টোবর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সারের চাহিদা ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন সার সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টন বেশি সার থাকবে। সরকারের ভাষ্য, মূল সমস্যা কিছু এলাকায় বিতরণ ব্যবস্থার সাময়িক অসুবিধা এবং শূন্য ডিলার পয়েন্ট।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আলোচনায় এ বাকযুদ্ধ হয়। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনের নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা সারের বাজার ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। নোটিশে দেশজুড়ে সার সঙ্কটে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়া, কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্য সঙ্কটের ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
সার নেই নয়, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই
কুড়িগ্রাম থেকে নির্বাচিত বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষিনীীতির প্রাণ হলো সার। আগামী রবি ও বোরো মৌসুম পর্যন্ত সঙ্কট অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, দেশে ১৯৯৫ ও ২০০৮ সালে সার সঙ্কট হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৯৫ সালের সঙ্কট ছিল ভয়াবহ। ওই সময় সারের দাবিতে আন্দোলনে কৃষক নিহত হওয়ার ঘটনা দেশের ইতিহাসে বেদনাদায়ক অধ্যায়।
সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকার কথা বলা হলেও উলিপুরের কৃষকরা সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন উল্লেখ করে সালেহী বলেন, তাদের কালোবাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীতে সার নিয়ে উত্তেজনা ও গুদাম ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। পুঠিয়ায় কৃষকদের ‘সার দাও, না হলে বিষ দাও’ বলার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায়ও অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন তিনি।
তার বক্তব্য, সার মজুদ থাকার পরও কৃষকের হাতে না পৌঁছানো মূলত ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতা। কালোবাজারি বন্ধ এবং ডিলার সিন্ডিকেট ভাঙতেও ব্যর্থতা রয়েছে।
সালেহী বলেন, ১০-১৫ দিনের মধ্যে কৃষকের কাছে যে সার পৌঁছানোর কথা, তা ৩০-৪০ দিনে পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হবে। ন্যায্যমূল্যের চেয়ে ৩০০-৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে বাজারদর ও মূল্যস্ফীতিতে।
তিনি ইউনিয়নভিত্তিক সার চাহিদা নিরূপণ, ডিজিটাল ডিমান্ড ম্যাপ, মোবাইল অ্যাপ ও রিয়েল টাইম ড্যাশবোর্ড চালুর প্রস্তাব দেন। কৃষক কার্ড বা ডিজিটাল আইডির মাধ্যমে কৃষকের প্রাপ্যতা অনুযায়ী সার বিতরণ, ডিলারের দোকানে ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং সার পরিবহনে রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং চালুরও দাবি জানান।
‘ডিলার নিয়োগে ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন’
পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দেশে সার নেই—বিতর্কটি এমন নয়; মূল সমস্যা সারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই। কৃষককে ন্যায্যমূল্যের চেয়ে ৩০০-৪০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
ডিলার নিয়োগে ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, কৃষককে দিনের পর দিন সার দোকানে ঘুরতে হলে সেটি রাষ্ট্রের জন্য সম্মানের নয়।
কুড়িগ্রামে অবৈধভাবে মজুদ করা দুই হাজার ১৫০ কেজি সার জব্দের ঘটনাও সংসদে তুলে ধরেন তিনি। একইসাথে সার মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান।
‘সঙ্কট মজুদের নয়, দুর্নীতি-লুটপাটের সুযোগের’
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, সার সঙ্কট মূলত মজুদের সমস্যা নয়; এটি ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অপচয় ও লুটপাটের সুযোগ তৈরির সমস্যা।
তিনি বলেন, সার কারখানা বন্ধ রেখে বেশি দামে জনগণের অর্থে সার কিনে মজুদ রাখা হচ্ছে। কিন্তু সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছছে না। এটাই সরকারের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।
সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগের বিষয়ে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ সংসদ ও জনগণকে জানানোর দাবি করেন তিনি।
সার ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত রিয়েল টাইম ডিজিটাল মনিটরিং চালুর প্রস্তাব দিয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, কোন গুদামে কত সার আছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কখন পৌঁছবে—এসব তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
বিসিআইসি ও বিএডিসির তথ্য সমন্বয় করে অঞ্চল ও ফসলভিত্তিক চাহিদার ওপর বরাদ্দ, কালোবাজারি ও মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং নতুন ডিলার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বাফার গুদাম থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছে সার বিক্রির প্রস্তাব দেন তিনি।
‘৩৭৫৯ ডিলার পয়েন্ট শূন্য’
বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে কৃষিমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক সার ডিলার এখনো বহাল থাকলেও তাদের অনেকে পলাতক। ফলে প্রায় তিন হাজার ৭৫৯টি ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে।
সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে পুরনো ডিলারদের বহাল রেখেই শূন্য পদে নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রত্যেক ইউনিয়নে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর হিসাবে দেশে বর্তমানে প্রায় ১১৫ জন মূল ডিলার ও ৩১ হাজার ৬০০ জন খুচরা ডিলার রয়েছেন। নতুন করে আট হাজার ৬৮৭ জন ডিলার নিয়োগ দেয়া হবে। তারা প্রত্যেকে দু’জন করে খুচরা ডিলার নিয়োগ করলে মাঠপর্যায়ে আরো প্রায় ১৬ হাজার খুচরা ডিলার যুক্ত হবে।
‘সার নিয়ে ২২ ঘটনা, ২০৪ মোবাইল কোর্ট’
মীর শাহে আলম বলেন, ২৯ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সার নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ২২টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও ম্যাজিস্ট্রেটরা ২০৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন। অতিরিক্ত মজুদ, সময়মতো সার বিতরণ না করা এবং গুদামে সার রেখে দেয়ার মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
দেশের সারের দাম ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় কম হওয়ায় কিছু সার পাচারের প্রবণতার তথ্য প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি। দু’টি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার এবং সার জব্দ করা হয়েছে।
‘চাহিদার চেয়ে ১৫.৮৪ লাখ টন বেশি সার থাকবে’
সরকারের সারের মজুদ পরিস্থিতি তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, অক্টোবর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে পাওয়া চাহিদা অনুযায়ী মোট সারের প্রয়োজন ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সরকার ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন সরবরাহের প্রস্তুতি রেখেছে।
ফলে চাহিদার তুলনায় ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টন বেশি সার থাকবে দাবি করে তিনি বলেন, নতুন ডিলার নিয়োগ সম্পন্ন হলে মাঠপর্যায়ে ডিলারের সংখ্যা বাড়বে এবং কিছু এলাকায় কৃত্রিম সঙ্কট দূর হবে।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী ও রৌমারীর ঘটনায় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয়ভাবে উসকানির কারণে কৃষকরা উত্তেজিত হয়ে রাস্তা অবরোধ করেছিলেন। পরে জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অন্য ডিলারের কাছ থেকে সার এনে বিতরণের ব্যবস্থা করে।
সংসদ সদস্যদের সার বিতরণে সরাসরি যুক্ত করার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, সার বিতরণের দায়িত্ব ডিলারদেরই পালন করা উচিত। সার-বীজ মনিটরিং কমিটিতে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
‘বর্তমানে ৪.০৪৯ লাখ টন ইউরিয়া মজুদ’
পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম বলেন, বিসিআইসি সার উৎপাদন ও আমদানি করে। উৎপাদিত ও আমদানিকৃত সার কারখানা ও বাফার গুদামে মজুদ রাখা হয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। তিনি জানান, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৯৯৯ মেট্রিক টন। আমদানি হয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৮৯৯ মেট্রিক টন। বিতরণ করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার ৯২৫ মেট্রিক টন। বর্তমানে মজুদ রয়েছে প্রায় চার লাখ চার হাজার ৯০০ মেট্রিক টন।
‘৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল’
মৎস্য ও প্রাণিসম্প প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।’ বর্তমানে আমন ধান কুশি পর্যায়ের শেষদিকে থাকায় সারের ব্যবহার তুলনামূলক কম। সামনে রবি মৌসুমের জন্য কৃষকরা সার সংগ্রহ করছেন।
সার ব্যবস্থাপনা তদারকিতে দেশের ৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল করা হয়েছে। দু’জন যুগ্ম সচিব ও দুইজন উপসচিবের তত্ত্বাবধানে এসব সেল কাজ করছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অনিয়মের কারণে এরই মধ্যে চার-পাঁচজন ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কৃষি প্রতিমন্ত্রী বলেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারের চাহিদা ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন এবং যোগান ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন। ফলে ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত থাকবে।
‘কৃষক কার্ডে জমি অনুযায়ী সার’
সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, টাঙ্গাইলে প্রথম কৃষক কার্ড উদ্বোধন করা হয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের জমির পরিমাণ অনুযায়ী কতটুকু সার প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা যাবে। এতে সারের অপচয় কমবে এবং কৃষক উৎপাদন-সংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা পাবেন।
তিনি বলেন, সরকার কৃষকের স্বার্থে সারের ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর করার চেষ্টা করছে। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ থাকলে মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিমকে জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।



