সংসদে সেতুমন্ত্রী

কর্ণফুলী টানেলে আয়ের দ্বিগুণ ব্যয়

বিআরটি দ্রুত চালু, গণপরিবহনে জিপিএস, দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ফিটনেসবিহীন যান অপসারণে সরকারের পদক্ষেপ

বর্তমান সরকারের কৃচ্ছসাধন নীতি এবং সেতু কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় কমিয়ে তা বর্তমানে দৈনিক ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

সংসদ প্রতিবেদক
কর্ণফুলী টানেল
কর্ণফুলী টানেল |সংগৃহীত

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে টোল থেকে যে আয় হয়, তার প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় হয় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে। বর্তমানে টোল থেকে প্রতিমাসে গড়ে আয় হয় ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৯০০ টাকা, বিপরীতে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হয় ৬ কোটি ৯৫ লাখ ১৮ হাজার ৬৯১ টাকা। টানেলের ভেতরে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, লাইটিং, বায়ু চলাচল, অগ্নি-নিরাপত্তা, সিসিটিভি এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যয় বেশি হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: আবুল হাসনাতের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে বিষয়টি উত্থাপিত হয়।

মন্ত্রী জানান, কর্ণফুলী টানেল চালুর পর প্রাথমিক পর্যায়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দৈনিক প্রায় ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় হতো। বর্তমান সরকারের কৃচ্ছসাধন নীতি এবং সেতু কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় কমিয়ে তা বর্তমানে দৈনিক ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। টানেলকে লাভজনক করতে সরকার আরো বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি জানান।

সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪০-এর সদস্য মোসা: নাজমুন নাহারের প্রশ্নের জবাবে সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘যানজট নিরসনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার করিডোরে দেশের প্রথম বিআরটি (বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট) দ্রুত চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জনগণের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি আরো উন্নত করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।’

ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও বিশৃঙ্খলা রোধ, গণপরিবহনের নিরাপত্তা এবং যানবাহনের অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রতিটি গণপরিবহনে জিপিএস স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রমকারী যানবাহনের চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।’

সংরক্ষিত আসন-৩৫-এর সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মহাসড়কের পরিবর্তে স্থানীয় ফিডার সড়কে চলাচল নিশ্চিত করতে এসব যানের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান এবং কঠোর রুট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্বলিত থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযান চলাচল নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।’

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘যেসব যানবাহনের ফিটনেসের মেয়াদ ১০ বছর আগে শেষ হলেও নবায়ন করা হয়নি, সেগুলো সড়ক থেকে অপসারণ করে নিবন্ধন বাতিল করা হচ্ছে। আর যেসব যানবাহনের ফিটনেস পাঁচ বছর আগে শেষ হয়েছে, সেগুলো নবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ দুই ধরনের যানবাহনের তালিকা পুলিশের কাছে পাঠানো এবং মালিকদের নোটিশ দেয়া হচ্ছে।’

জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে সেতুমন্ত্রী জানান, দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সাথে দরকষাকষি শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই চুক্তি স্বাক্ষর হবে। এ ক্ষেত্রে বগুড়ার সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ, গাইবান্ধার বালাসী-দেওয়ানগঞ্জ এবং অন্য একটি সম্ভাব্য করিডোর বিবেচনায় রয়েছে।

এদিকে, সংরক্ষিত আসন-১১-এর সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে রেলমন্ত্রী জানান, ‘ঢাকা মহানগরের তিনটি পৃথক লেভেল ক্রসিং গেটে বুয়েটের সহায়তায় পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে গুরুত্বপূর্ণ সব অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ে পর্যায়ক্রমে অটোমেটিক ব্যারিয়ার, ক্যামেরা ও স্মার্ট গেট সিস্টেম স্থাপন করা হবে।

অন্যদিকে, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো: জাহিদ হোসেন সংসদকে জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ২৪ ঘণ্টার টোল-ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইন-১০৯-এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৮৮ লাখ ৪৬ হাজার ৯৪০ জন নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেয়া হয়েছে।

জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০২৬ ইতোমধ্যে সংসদে পাস হয়েছে। এ আইনের আওতায় শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিচার হবে। এছাড়া ডিএনএ আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীর সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করার বিধানও যুক্ত হয়েছে।’

মন্ত্রী জানান, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে ৩৭টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) স্থাপন করা হবে। বর্তমানে ১৪টি ওসিসি থেকে চিকিৎসা, আইনি ও পুলিশি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও আয়বর্ধক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সেবা দেয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ৮২ হাজার ৬৭৮ জন সেবা পেয়েছেন। এছাড়া জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থাপিত ৯৫টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেল থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫২৩ জন নারী ও শিশুকে বিভিন্ন সেবা দেয়া হয়েছে।

সমাজের অনগ্রসর নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেলাই মেশিন ক্রয়ের জন্য ৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্রয় কার্যক্রম শেষে পর্যায়ক্রমে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হবে।

নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের প্রশ্নের জবাবে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, বর্তমানে সরকারিভাবে কোনো পাটকল চালু নেই। ফলে নতুন করে সরকারি পাটক্রয় ও সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনেরও কোনো পরিকল্পনা নেই।

তিনি জানান, বিজেএমসির ২৫টি পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের পর ২০টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে ১৪টি মিল ইজারা দেয়া হয়েছে এবং ৯টি ইতোমধ্যে উৎপাদনে গেছে। বাকি ছয়টি মিল ইজারা দেয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য মো: আব্দুস সালামের প্রশ্নের জবাবে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বলেন, দেশে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি মিটার বস্ত্রের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ কোটি মিটার ওভেন এবং ৪০০ কোটি মিটার নিট কাপড়ের চাহিদা। দেশীয় মিলগুলো নিট কাপড়ের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং ওভেন কাপড়ের প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে। এছাড়া হস্তচালিত তাঁতশিল্প থেকে বছরে ৪৭ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার মিটার কাপড় উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট বস্ত্র চাহিদার প্রায় ২৮ শতাংশ পূরণ করছে।