অজস্র মানুষের শ্রদ্ধা, দোয়া ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জাতীয়তাবাদী শক্তির বাতিঘর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল, এক শোকার্ত বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়, স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে। এর আগে দেশের এই আইকনিক রাষ্ট্রনায়কের জানাজায় অংশ নেন লাখ লাখ মানুষ। জানাজার সেই জনস্রোত যেন এক কথায় বলছিল- একটি কফিনের পাশে পুরো বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে।
গত মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রোগভোগ, কারাবাস এবং রাজনৈতিক নিগ্রহের পর এই বিদায় যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন করল। রাষ্ট্রীয় শোকের প্রথম দিনে তার জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউ জানাজাস্থল হলেও লাখো মানুষের সারি বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
জনজোয়ার ও সামাজিক প্রভাব
জানাজার প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য, প্রধান বিচারপতি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনীতিক এবং বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া বিদেশী অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের পার্লামেন্ট স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুংগিয়েল, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ এবং মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ও উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ।
বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ- চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, দোকানদার, রিকশাচালক থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক পর্যন্ত- জানাজার অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত ছিলেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অশ্রুসজল চোখে দেশনেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বিশেষত নারীরা, যাদের প্রধান জানাজাস্থলে প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল, আশপাশের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কফিনের পাশে দোয়া ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তারেক রহমানের আবেগপূর্ণ উপস্থিতি
বেলা ৩টার দিকে জানাজা শুরুর আগে তারেক রহমান মঞ্চে দাঁড়িয়ে মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন। মৃত্যুর বেদনাকে প্রকাশ্যে অনুভব করে তিনি বললেন, ‘আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। যদি জীবিত থাকাকালীন সময়ে তিনি কারো কাছ থেকে ঋণ নেন, আমি সেটি পরিশোধ করব। যদি কেউ তার কোনো কথায় বা কাজে আঘাত পেয়ে থাকেন, আমি তার পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থী। আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে বেহেশত দান করেন।’
প্রধান উপদেষ্টার পাশে দাঁড়িয়ে তারেককে সান্ত্বনা দেন, যা জানান দেয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পারিবারিক আবেগের মিলিত ছাপ।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই : জানাজার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে বন্দী ছিলেন। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তার অসুস্থতা বেড়ে যায়, যা অবশেষে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।
নজরুল ইসলাম খান আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা এবং দেশের স্বার্থে অনমনীয়তা তাকে তার প্রতিপক্ষের কাছে ব্যক্তিগত শত্রুতে পরিণত করেছিল। স্বৈরাচার হাসিনা, এরশাদ বা ১/১১ সরকারের সময়ও তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তবুও, তিনি মতপ্রকাশ ও ভোটাধিকারে আপস করেননি। ফলে তিনি ফ্যাসিস্ট শাসনবিরোধী লড়াইয়ের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হয়ে ওঠেন।’ তিনি উল্লেখ করেন, দেশনেত্রী সব অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে আজ লাখ কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃশ্য।
দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা : জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেকের ইমামতিত্বে জানাজা শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সংসদ ভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় জাতীয় পতাকায় মোড়া লাশবাহী গাড়িতে খালেদা জিয়ার কফিন জিয়া উদ্যানে নেয়া হয়। কবরের কাছে পৌঁছার পর সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা কফিন কাঁধে বহন করেন। বিকেল ৫টার কিছু আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।
দাফনের প্রক্রিয়া চলাকালীন তারেক রহমান, স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, ছোটভাই আরাফাত রহমানের স্ত্রী শর্মিলা রহমান, তার ছোট মেয়ে জাফিরা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা এবং বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ দাঁড়িয়ে শোক ও শ্রদ্ধা জানান। প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়, যা তিনবাহিনীর প্রধানরাও সম্পন্ন করেন। বিএনপির পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা দেন তারেক রহমান। পরে মরহুমের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাকে সমাহিত করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যানে, যা বর্তমানে জিয়া উদ্যান নামে পরিচিত।
মায়ের কফিনের পাশে কুরআন তিলাওয়াত : সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লাশ জাতীয় পতাকায় মোড়ানো গাড়িতে বের করা হয়। গাড়িটি ৯টা ১৭ মিনিটে তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউস্থ বাসায় পৌঁছায়। পরিবারের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানান। তারেক রহমান মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন।
বেলা ১১টা ৪ মিনিটে তারেক রহমানের বাসা থেকে কড়া নিরাপত্তায় জাতীয় সংসদ ভবনে লাশ নিয়ে আসা হয়। গাড়িবহরে থাকা লাল-সবুজ রঙের বাসে চড়ে সংসদ ভবনে পৌঁছান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গাড়ি সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়, যেখানে জনস্রোতও সর্বাধিক।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা : খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন কার্যক্রম ঘিরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল, জাতীয় সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যান এলাকা ছিল নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায়। বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া : বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় বিদেশী কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিকও তুলে ধরে। ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি জানাজার মাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এই উপস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জনমতের গুরুত্বকেও প্রতিফলিত করেছে।
জনজোয়ারের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব : বেশ কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভিড়ের চাপ এবং মানুষের আবেগপূর্ণ উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের একটি অসামান্য দৃশ্য তৈরি করেছে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। জনজোয়ার দেখিয়েছে, একজন রাষ্ট্রনায়ক ক্ষমতায় না থাকলেও গণমানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।
বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতি, সামাজিক সংহতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তার জানাজা ও দাফন কার্যক্রম রাজনৈতিক ইতিহাসে অম্লান ছাপ ফেলেছে। জনজোয়ার, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য সবই প্রমাণ করে, তিনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও গণমানুষের হৃদয়ে অমর। এই বিদায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



