বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। একই সাথে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংবিধান সংস্কার ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে ঐতিহাসিক গণভোট। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় একযোগে দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে জমতে শুরু করে মানুষের ভিড়। সকাল বাড়ার সাথে সাথে সেই ভিড় পরিণত হয় দীর্ঘ সারিতে। নারী, পুরুষ, তরুণ, প্রবীণ- সব বয়সী ভোটারদের উপস্থিতিতে অনেক কেন্দ্রেই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ৭টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। তবে তার আগেই নির্বাচন কর্মকর্তারা কেন্দ্রে পৌঁছে ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, সিল, ভোটার তালিকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত করেন। পোলিং কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা আর নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক উপস্থিতি মিলিয়ে কেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয় নিয়ন্ত্রিত কিন্তু প্রাণবন্ত পরিবেশ।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে রয়েছে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য। নির্বাচন কমিশন (ইসি ) সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজারের বেশি।
প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে দেয়া হয়েছে ২৫ হাজার ৭০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা। পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার তথ্য দ্রুত জানাতে চালু রয়েছে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ এবং অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন নম্বর ৩৩৩।
এবার ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। সারা দেশে ভোট গ্রহণ হবে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ও জামায়াতে প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। ফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি প্রবাসী ব্যালট দেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার ৩৮টি ব্যালট গ্রহণ করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। প্রবাসী ভোটসহ পোস্টাল ব্যালটগুলো মূল ভোট গণনার সাথে যুক্ত করা হবে।
২০০৮ সালে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরুর পর এবারই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ মোট ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ২৯ জন; এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৪ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮০ জন। এবার ১১৯টি নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিতে ঢাকায় পৌঁছেছেন অন্তত ৩৯৪ জন বিদেশী নির্বাচনী পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭ জন বিদেশী সাংবাদিক। পাশাপাশি ৫৫ হাজারের বেশি দেশি পর্যবেক্ষকও মাঠে রয়েছেন। ইসি জানিয়েছে, সবাই নির্ধারিত গাইডলাইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। দীর্ঘ সংস্কার প্রক্রিয়ার পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশজুড়ে যেমন রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, তেমনি রয়েছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশা। এখন কেবল ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায় পুরো দেশ।
গণভোটের কারণে এক ঘণ্টা বাড়িয়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হবে। এরপরই কেন্দ্রেই শুরু হবে ভোট গণনা। গণনা শেষে ফলাফলের বিবরণী কেন্দ্রের নোটিশ বোর্ডে টানানো হবে এবং ধাপে ধাপে ফল প্রকাশ করা হবে। ইসি আশা করছে, ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চূড়ান্ত ফল জানা যাবে।