গঠন হচ্ছে স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ সম্পাদকীয় প্ল্যাটফর্ম

ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের আহ্বান সম্পাদকদের

বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের জানার অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানই সংবাদকক্ষগুলোকে আবারো নির্ভীক সাংবাদিকতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। সম্পাদকদের ঐক্য সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও সত্য প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনগণের জানার অধিকার রক্ষায় একটি ঐক্যবদ্ধ সম্পাদকীয় প্ল্যাটফর্ম গঠনের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকরা।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

এতে বলা হয়, দীর্ঘ স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পর রাষ্ট্র যখন পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, তখন সমাজের প্রতিটি স্তরে সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস জরুরি হয়ে উঠেছে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করতে পারে গণমাধ্যম। তবে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংবাদমাধ্যমের ওপর গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা সহজ নয়।

সম্পাদকরা বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গণমাধ্যমের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। শুধু সরকারি বিধিনিষেধ নয়, বরং ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা স্বপ্রণোদিত হয়ে সত্য প্রকাশে বিরত থাকার যে সংস্কৃতি গত বছরগুলোতে তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। এককভাবে কোনো সম্পাদকের পক্ষে এই ভয় ও চাপের দেয়াল ভাঙা কঠিন হলেও সম্পাদকরা সম্মিলিতভাবে দৃঢ় অবস্থান নিলে তা সাংবাদিক সমাজে সাহস ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের জানার অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানই সংবাদকক্ষগুলোকে আবারো নির্ভীক সাংবাদিকতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। সম্পাদকদের ঐক্য সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও সত্য প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

সম্পাদকরা আরো বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে অনেক গণমাধ্যমের মালিকানা নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। এসব গোষ্ঠী সাংবাদিকতাকে জনস্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের একটি অংশকে ব্যবহার করা হয়েছে ফ্যাসিবাদী বয়ান তৈরিতে এবং সমাজে বিভাজন ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে। এর ফলে সম্পাদকদের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও পারস্পরিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তারা মনে করেন, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে করপোরেট ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পাদকীয় নীতিকে মুক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সম্পাদকদের মধ্যে যদি শক্তিশালী ও আপসহীন ঐক্য গড়ে ওঠে, তাহলে মালিকপক্ষের অন্যায্য হস্তক্ষেপের পাশাপাশি সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, অতীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো বিভিন্ন দমনমূলক আইন ব্যবহার করে সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সরকারের সময়ে এসব আইনের সংস্কার কিংবা পূর্ণাঙ্গ বিলোপ নিশ্চিত করা জরুরি। তবে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ধরনের দাবি আদায় সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সব ধারার সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সম্মিলিত ও নিয়মতান্ত্রিক চাপ।

সম্পাদকরা বলেন, সম্পাদকদের ঐক্য শুধু অধিকার আদায়ের জন্য নয়, বরং সাংবাদিকতার আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক মানদণ্ড পুনর্গঠনের জন্যও জরুরি। একটি ঐক্যবদ্ধ ফোরামের মাধ্যমে সাংবাদিকতার বৈশ্বিক নীতি, পেশাগত নৈতিকতা ও জবাবদিহির মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যাতে গণমাধ্যম নিজেই নিজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় বা বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়।

তারা সতর্ক করে বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ফ্যাসিবাদ সরাসরি বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া ক্ষত ও দোসররা সমাজের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় থাকে। গণমাধ্যমের অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে তারা আবারো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। তাই বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে সঙ্কটকালে সম্পাদকদের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল, বর্তমান সময়েও সেই দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

বিবৃতিতে সম্পাদকরা বলেন, দেশের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে সম্পাদকদের এই ঐক্য কেবল একটি পেশাজীবী জোট হবে না; বরং এটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘নিরাপত্তা প্রাচীর’ হিসেবে কাজ করবে।

তারা জানান, প্রস্তাবিত এই সম্পাদকীয় প্ল্যাটফর্ম কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতের প্রতিনিধিত্ব করবে না; বরং দল-মত নির্বিশেষে দেশের সব গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকবে।

বিবৃতিতে অনৈক্য, সংকীর্ণতা ও বিভেদের দেয়াল ভেঙে দেশের সব সম্পাদককে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অচিরেই এ বিষয়ে সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও ঘোষণা করা হয়েছে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন—শফিক রেহমান (যায়যায় দিন), মাহমুদুর রহমান (আমার দেশ), সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (নয়াদিগন্ত), আবদুল হাই শিকদার (যুগান্তর), আবু তাহের (বাংলাদেশ প্রতিদিন), মারুফ কামাল খান সোহেল (প্রতিদিনের বাংলাদেশ), হাসান হাফিজ (কালের কণ্ঠ), আযম মীর শহীদুল আহসান (সংগ্রাম), মোকাররম হোসেন (নিউ নেশন), শফিকুল আলম (ওয়াদা), সৈয়দ মেসবাহ উদ্দীন (বাংলাদেশের খবর), , মোস্তফা কামাল (খবরের কাগজ), বেলায়েত হোসেন (ভোরের ডাক), ওবায়দুর রহমান শাহীন (জনতা), শহীদুল ইসলাম (মানবকণ্ঠ), মো. সায়েম ফারুকী (রূপালী বাংলাদেশ), মনির হোসেন (খোলা কাগজ), ইলিয়াস খান (টাইমস অব বাংলাদেশ), মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব (বাংলাবাজার পত্রিকা), শেখ নজরুল ইসলাম (খবর সংযোগ), আবুল কাশেম মজুমদার (ক্যাপিটাল নিউজ), ব্যারিস্টার মো. মারুফ ইব্রাহীম আকাশ (খবরপত্র), শামসুল হক দুররানি (নওরোজ), শাহাদাত হোসেন শাহীন (গণমুক্তি), আফসার উদ্দিন চৌধুরী (কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম), সোহেল মাহবুব (নতুন প্রভাত, রাজশাহী), মাহবুবা পারভিন (অনির্বাণ, খুলনা), শান্তনু ইসলাম সুমিত (লোকসমাজ, যশোর), খন্দকার মোস্তফা সরোয়ার অনু (দাবানল, রংপুর), মততাজ শিরিন ভরসা (যুগের আলো, রংপুর), আশরাফুল হক (প্রবাহ, খুলনা), মুক্তাবিস উন নূর (জালালাবাদ, সিলেট) এবং সাইফুল ইসলাম (নিউ টাইমস, ময়মনসিংহ)।