ডেঙ্গু রোধে গুরুত্বারোপ

প্রতি শনিবার অভিযান চালাতে জনপ্রতিনিধিদের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

‘নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রধান ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া মোকাবেলায় আগাম ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ উদ্যোগে সুফল আসবে, যদি এটি লোক দেখানো না হয়।’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান |ফাইল ছবি

গত কয়েক বছর ধরে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম ছয় মাসে খুব একটা আক্রান্ত হয় না। কিন্তু বছরের শেষ ছয় মাসে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে অনেকেই প্রাণ হারান। এ নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্যের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গা থেকে সতর্ক করা হতো। পরামর্শ দেয়া হতো আগাম ব্যবস্থা নেয়ার। কিন্তু বিগত সময়ে কার্যকর তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে এবার তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রধান ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া মোকাবেলায় আগাম ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ উদ্যোগে সুফল আসবে, যদি এটি লোক দেখানো না হয়।

গত ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ভিডিও বার্তা দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শনিবার থেকে সারাদেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হচ্ছে। ভিডিও বার্তায় প্রধামমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে থেকেই সরকার ১৪ মার্চ থেকে প্রতি সপ্তাহে সারাদেশে পরচ্ছিন্নতা অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি এলাকার জাতীয় সংসদ সদস্যসহ সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আমার আহ্বান, জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার আপনারা যার যার এলাকার নিজ নিজ বসতবাড়ি এবং আশেপাশের এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করুন। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চললে, আসন্ন দিনে ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার মতো মরণঘাতী জ্বর থেকে জনগণ নিজেদেরকে রক্ষা করতে সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মূল নীতি হচ্ছে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।

অতএব, কোথাও ময়লা পানি জমে থাকতে দেবেন না। নিজের বাসা-বাড়ি এবং আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। এডিস কিংবা চিকুনগুনিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করুন নিজেদেরকে রক্ষা করুন, অপরকে রক্ষা করুন।’

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ খুবই ইতিবাচক। দেশের সর্ব্বোচ্চ কর্নধর যখন কোনো একটি বিষয়ে সচেতন থাকেন এবং আন্তরিকতা দেখান, তখন কিন্তু কাজ হয়।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। লোক দেখানো না হলে এতে সুফল আসতেই হবে।’ এ কর্মসূচি যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা লোক দেখানো কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

কবিরুল বাশার বলেন, ‘যেসব ড্রেন, ডোবা, নর্দমাগুলো ময়লায় আটকে আছে, সেগুলো পরিষ্কার করে কীটনাশক দিয়ে লার্ভা মেরে দিতে হবে। লার্ভা মেরে দিতে পারলে, মশার ঘনত্ব কমে আসবে। এখন কিউলেক্স মশা অনেক বেশি। তবে বৃষ্টি শুরু হলে এটা কমে যাবে। তখন এডিশ মশা বাড়তে শুরু করবে। তার আগেই বিস্তার আটকে দিতে হবে।’

তিনি বলেন, যদি পরিকল্পিতভাবে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং মশার প্রজননস্থলগুলো সঠিকভাবে ধ্বংস করা যায়, তাহলেই বাস্তব সুফল পাওয়া সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যাবে। আমরা আন্তরিক ভাবে যদি এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান করতে পারি, তাহলে মশা এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একধাপ এগিয়ে যাব।’

পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এ বিষয়ে খুলনা-৪ আসনে সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল জানান, তার নির্বাচিত এলাকার তিনটি উপজেলায় ১৩৫টি ওয়ার্ডে ১৩৫টি কমিটি গঠন করেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রথম শনিবার এই কমিটি নিয়ে জনগণের মধ্যে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা হবে। পরের শনিবার আমরা সবাই মিলে একসাথে ডোবা নালা নর্দমা পরিস্কার করব।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: রাসেল রহমান জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুস সালাম যাত্রাবাড়ির ধলপুর যান্ত্রিক ওয়ার্কশপে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান, স্বল্পমেয়াদী কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মশালা উদ্বোধন এবং প্রকল্প হতে ক্রয়কৃত যান-যন্ত্রপাতির চাবি হস্তান্তর করবেন।

২০১৯ সালের পর থেকেই প্রতিবছরই দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ না থাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি।

২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেয়া প্রতি বছরের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের প্রথম ছয় মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ কম। শেষের ছয় মাস বেশি ছিল। কোনো বছর জুলাই-আগস্ট, কোনো বছর আগস্ট-সেপ্টেম্বর আবার কোনো বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, অক্টোবর-নভেম্বর ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কখনো কখনো তিন-চার মাস ভয়াবহতা ছিল।

২০১৯ সালের এক লাখ এক হাজার ৩৭৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়। ২০২০ সালে করোনার কারণে ডেঙ্গুর দিকে নজর ছিল না। ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। মৃত্যু হয় ১০৫ জনের। ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় ২৮১ জনের। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মৃত্যু হয় এক হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন। মারা গেছেন ৫৭৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেঙ্গু নিয়ে এক লাখ দু’ হাজার ৮৬১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৪১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ওই বছর পাঁচশর কম করে ভর্তি হয় ৩২ জেলায়। বাকি ৩২ জেলায় পাঁচশ থেকে দশ হাজারের মধ্যে রোগী ভর্তি হয়েছে ।

এর মধ্যে দুই-দশ হাজারের মধ্যে রোগী ভর্তি হয়েছে আট জেলায়। সব চেয়ে বেশি বরগুনা; নয় হাজার ৫৩৪ জন, গাজীপুরে; চার হাজার ৭৫৪, চট্টগ্রামে চার হাজার ৭২৯, পটুয়াখালীতে চার হাজার ৫৯৩, বরিশালে চার হাজার ৫৩, ময়মনসিংহে তিন হাজার সাত, কুমিল্লায় তিন হাজার, মানিকগঞ্জে দু’ হাজার ৪১৩ জন।

দেড়-দুই হাজারের মধ্যে রোগী ভর্তি হয়েছে পাঁচ জেলায়। নারায়নগঞ্জে এক হাজার ৯২৮, চাঁদপুরে এক হাজার ৮৬৭, পিরোজপুর এক হাজার ৭৬৩, চাপাইনবাবগঞ্জ এক হাজার ৭১৫, কক্সবাজার এক হাজার ৭০৫ জন। এক-দেড় হাজারের মধ্যে সাত জেলায়- কিশোরগঞ্জে এক হাজার ৩৭০, নরসিংদী এক হাজার ৩৫৪, রাজশাহী এক হাজার ৩০৯, টাঙ্গাইলে এক হাজার ২৯৮, যশোরে এক হাজার ২৮২, মাদারীপুর এক হাজার ২৬৩, খুলনায় এক হাজার ১৯৬ জন। পাঁচশ থেকে এক হাজারের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ১২ জেলায়- সিরাজগঞ্জে ৯২৬, ফেনী ৮৫৫, ঢাকা জেলায় ৮২৮, ভোলায় ৮১০, ঝালকাঠিতে ৭৯৪, বান্দরবন ৭৬৩, জামালপুরে ৭৪৮, বগুড়ায় ৬৭৩, কুষ্টিয়া ৬৩০, পাবনায় ৬০৪, লক্ষীপুরে ৫৭৭, ব্রাক্ষণবাড়িয়া ৫৬০ জন।

২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটির হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩১ হাজার ৬৮২ জন। কিন্তু দুই সিটি করপোরেশনের দাবি রাজধানী হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মাত্র ছয় হাজার ৫৮০ জন রাজধানীর বাসিন্দা। অন্যরা কোন জেলা বা বিভাগের তা তারা নিশ্চিত নয়। এছাড়া ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৭ হাজার ৩৮৬ জন। ঢাকা বিভাগ ও ঢাকার দুই সিটির হাসপাতালে ৪৯ হাজার ৮৬ জন ভর্তি হয়। যা প্রায় অন্য সাত বিভাগের সমান।

দেশের আটটি বিভাগ ও ঢাকার দুইটি সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী তথ্য সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। তথ্য নেয়া হয় ঢাকার সরকারী ১৯টি এবং স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি মিলে আরো ৫৯টি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর। এছাড়া ঢাকার বাইরে জেলাভিত্তিক সকল সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে ঢাকার অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এবং ঢাকার বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ভর্তি রোগীর তথ্য নেয়া হয় না। এর বাইরে যারা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন না সেই তথ্যও আসে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘আসলে কতজন আক্রান্ত ও ভর্তি হয়, মারা যায়- প্রকৃত সংখ্যা কেউই জানি না। প্রকৃত সংখ্যা কী এর থেকে তিনগুন, পাঁচগুন, ১০ গুন-নাকি আরো বেশি তাও কেউ জানি না।’