জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ধারা বাতিল করার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ১৭টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শনিবার (১১ এপ্রিল) এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ২০১৬ সালে ১ মার্চ আপিল বিভাগের দেয়া এক রায়ে বাংলাদেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। ই-সিগারেট, ভ্যাপ ও নিকোটিন পাউচ বৈধ করার এ সিদ্ধান্ত ওই রায়ের পরিপন্থী।
শুধু তাই নয়, ২০০৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই অগ্রগতির বিপরীতমুখী এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক। এ সিদ্ধান্তে জনস্বাস্থ্য বিপন্ন হয়ে তরুণ প্রজন্ম হুমকিতে পড়বে।
সম্মিলিতভাবে বিবৃতিটি প্রদানকারী সংগঠনগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট (বাটা), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন), বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, এইড সোস্যাইটি, আর্থ ফাউন্ডেশন, সেতু, লিডার্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, লেটথ ওয়ার্ক, প্রত্যাশা মাদকবিরোধী সংগঠন, পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্য আন্দোলন, তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ), ইউনাইটেড ফোরাম এগেইনস্ট টোব্যাকো, স্কুল অব লাইফ, ইয়ুথ ফর টোব্যাকো ফ্রি বাংলাদেশ।
বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬ পাস হয়েছে। সংশোধিত আইনে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, নিকোটিন পাউচসহ সকল ধরনের ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট নিষিদ্ধের বিধান বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্য কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাজারে উন্মুক্ত হয়ে পড়বে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষ করে দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সংসদে উল্লেখ করেছেন যে, রাজস্ব আদায়ের বিষয় বিবেচনায় রেখে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বাতিল করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে তামাকজনিত ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ফলে এ সিদ্ধান্ত ‘রোগের অর্থনীতি’কে উৎসাহিত করবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, ই-সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশ্বের ১৩২টি দেশ ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করেছে, যার মধ্যে ৪৬টি দেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। এ থেকে স্পষ্ট যে, বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেয়া হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ উল্টো পথে অগ্রসর হচ্ছে। ই-সিগারেট বর্তমানে কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণই নয়, বরং মাদক গ্রহণের একটি মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্যে জানা গেছে, কিছু চক্র ভ্যাপ লিকুইডে এমডিএমবি নামক বিপজ্জনক মাদক মিশিয়ে সরবরাহ করছে, যা ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামে পরিচিত এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব পণ্য বাজারে ছেড়ে দেয়া যুবসমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এছাড়া, মাত্র ৬১ কোটি টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিকে দেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের বহু দেশ যেখানে এ ধরনের পণ্য নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করছে, সেখানে বাংলাদেশে এর উৎপাদনের অনুমোদন জনস্বার্থের পরিপন্থী। ২০০৫ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের মূল চেতনা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অঙ্গীকার রক্ষার্থে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচসহ সকল ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট পুনরায় নিষিদ্ধ করার জন্য দ্রুত কার্যকর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান সংগঠনের নেতারা।



