রিকভারি অ্যান্ড এডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট প্রকল্পের রিইন্টিগ্রেশন কর্মসূচির আওতায় বিদেশফেরত প্রায় দেড় লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। গত দু’ বছরে প্রণোদনা পেয়েছে ২,২৫,২৯৩ জন কর্মী। যার পরিমাণ ৩৪১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ পাঠানো হয়েছে। যাদের অধিকাংশই চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরেন খালি হাতে। এ প্রকল্পের সহযোগিতায় তারা এখন সবাই স্বাবলম্বী এবং সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশফেরত প্রবাসীদের স্বপ্ন পূরণের এ কাজটি করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। আর এ কাজে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রথম এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোনো রিইন্টিগ্রেশন কর্মসূচি। এ প্রকল্পের উপকারভোগীরা নানা খাতে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে গ্রোসারী শপ, কাপড়ের ব্যবসা, ড্রাইভিং, পোলট্রি, ডেইরি, ছাগল ও গরু পালন, বিফ ফ্যাটারিং, ফলের বাগান, বাণিজ্যিক কৃষি ও মৎস্য চাষ ইত্যাদি। মেশন, টেইলারিং অ্যান্ড ড্রেস মেকিং, ইলেকট্রিশিয়ান, কন্সট্রাকশন, কার্পেন্টার, পেইন্টার, ওয়েলডিং, গোল্ড স্মিথ, রড বাইন্ডিং, মোবাইল সার্ভিসিং, টাইলস ফিটিং, ইন্ডাসট্রিয়াল, অটো মেকানিক, কাটিং মাস্টার, প্লাম্বার, সেলুনের কাজ করছেন।
এছাড়া ইলেকট্রিক, ফার্ণিচার, কনফেকশনারি, স্যানিটারি, গার্মেন্টস পণ্য, ফার্মেসি, হার্ডওয়্যার, জুতা, অটো পার্টস, থাই গ্লাস, রাইস মিল, মিস্টি, স্টেশনারি, হোটেল, মুদি দোকান, চায়ের দোকান, ভেজিটেবল, ফলসহ নানা ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। শুধু ব্যবসা নয়, বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি কর্মী। উপকারভোগীদের অনেকে ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষক, বাবুর্চি, ইমাম, মুয়াজ্জিন, শেফ, গ্রাম্য চিকিৎসক, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়ারসহ নানা পেশায় যুক্ত হয়ে কাজ করছে।
দেশের ৩৫টি জেলায় ‘প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার’ স্থাপন করে সারাদেশে প্রকল্প কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশফেরত কর্মীদের নিবন্ধনপূর্বক ওরিয়েন্টেশন এবং কাউন্সিলিং প্রদান করা হয়। কাউন্সিলিংয়ে তার আগ্রহ ও চাহিদা নিরুপণ করে রেফারেলের আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রাপ্তিতে সহযোগিতা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্প থেকে তাদের ব্যাংক হিসাবে প্রনোদনার ১৩ হাজার ৫০০ টাকা করে দেয়া হয়েছে। এর ফলে তারা উদ্যোক্তা, ব্যবসার জন্য ঋণ এবং দক্ষতা অর্জনে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নানা কাজে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সাবলম্বী হয়েছেন। এ কাজ বাস্তবায়নে নিবন্ধন থেকে সেবা প্রাপ্তিসহ নিবিড় তদারকির কারণে এক লাখ ৩৯ হাজার কর্মী আবারো ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মী যুক্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায় ১০ হাজার ৫৮৮ জন, পশু পালন ও পোল্ট্রি খামারে ৯৪২১ জন, ব্যবসায় ৪৭৮৪ জন, কৃষিকাজে ৫১ হাজার ৩৩৬ জন, দক্ষ কর্মী হিসেবে ৮৭৯৬ জন, বেসরকারি চাকরিতে ৫৪০৪ জন, মৎস্য কাজে ৩২২৯ জন। এছাড়াও ড্রাইভিং পেশায় ৭২২৯ জন, স্কিল্ড ওয়ার্কার ৮৭৯৬, প্রফেশনাল ক্যাটাগরিতে ৪৯৭ জনসহ নানান ধরনের ব্যবসায় সম্পৃক্ত ৬২৩৬ জন।
প্রকল্পের উপকারভোগীদের মধ্যে পুনরায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে ৭৭৩ জন এবং মারা গেছে ৭০ জন। বিভিন্ন কাজে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে ৩০ হাজার ৯৩০০০ জন কর্মী। নিবন্ধন পরবর্তী প্রতি এক বছর ফলোআপে রাখা হয়। কর্মীদের সেবা প্রাপ্তিতে ভোগান্তিতে পড়তে না হয় সে লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি ২৭টি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। বিদেশফেরতদের জন্য ইতোপূর্বে সরকারের কোনো উদ্যোগ ছিল না। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ফেরত প্রবাসীদের পুনর্বাসনে সরকার কাজ শুরু করেছে।
রেইজ প্রকল্পের উপকারভোগী খুলনার শাহানারা আক্তার শানু। যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, শারীরিক ও মানুষিকভাবে নির্যাতিত হয়ে আমি দেশে ফেরত আসি। অনেকদিন না খেয়ে থাকায় এয়ারপোর্টে এসে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। দেশে আসার পর আমার আশেপাশের মানুষজন আমাকে অনেক কটু কথা শুনাতো। এমন এক দুঃসময়ে স্থানীয় এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিদেশফেরতদের সহযোগিতার কথা শুনে খুলনায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার অফিসে যাই। সেখানে যাওয়ার পর কাগজপত্র চেক করে আমার নাম নিবন্ধন ও কাউন্সেলিং করে। তাদের পরামর্শ এবং সহযোগিতায় বিসিক অফিস হতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। পরবর্তী সময়ে সেন্টারের সহযোগিতায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে বীমার ৫০ হাজার টাকার ব্যবস্থা করা হয়। তারা আমার ব্যাংকে প্রকল্প থেকে প্রণোদনার ১৩ হাজার ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দেয়। ওই টাকা দিয়ে আমি চায়ের দোকান শুরু করি। আমার আগ্রহের কারণে প্রকল্প থেকে মহিলা অধিদফতরের ফ্রি সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে চা-পান বিক্রির পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজও করছি। এর পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতায় ফুড কার্টের মাধ্যমে ফাস্ট ফুডের ব্যবসা শুরু করেছি। এখন আমি রেইজ প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় ব্যাগ তৈরির দুই মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি। প্রশিক্ষণ শেষে ২০ হাজার টাকা ভাতাও পাব। বর্তমানে আমি খুব ভালো আছি। সংসারের খরচসহ ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছি। এ ধরনের সেবা পেয়ে আমি নিজেকে স্বাবলম্বী করতে পেরেছি।
প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. এ টি এম মাহবুব-উল করিম বলেন, রেইজ প্রকল্প বিদেশফেরত প্রবাসীদের পুনঃএকত্রীকরণে সরকারের একমাত্র উদ্যোগ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সিনিয়র সচিবের দিকনির্দেশনা এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সারাদেশে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রকল্পের উপকারভোগীর অধিকাংশকে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। তাদেরকে নিয়মিতভাবে মনিটরিং করছি।’



