২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নতুন ক্যালেন্ডার বছর নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ এককেন্দ্রিক ক্ষমতার অবসান, অন্তর্বর্তী সরকারের উত্থান, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ও জাতীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি– এই সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে এক অনিশ্চিত কিন্তু সম্ভাবনাময় রূপান্তরকালীন অধ্যায়ে। অর্থনীতি, রাজনীতি, কৌশলগত অবস্থান ও সংস্কৃতি- রাষ্ট্রের এই চারটি ভিত্তিই ২০২৬ সালে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।
এই চার ক্ষেত্রের গতিপথ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। অর্থনৈতিক দুর্বলতা কৌশলগত নির্ভরতা বাড়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখে, আর সাংস্কৃতিক দমবন্ধ অবস্থা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে। তাই ২০২৬ সালের বাংলাদেশকে বুঝতে হলে এই চারটি মাত্রাকে সমন্বিতভাবে দেখাই একমাত্র উপায়।
রাজনৈতিকভাবে ২০২৬ সাল একটি পরীক্ষার বছর। একদিকে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ নির্বাচন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রশাসনের রাজনীতিকরণ মুক্তকরণ। অন্য দিকে পুরনো শক্তির পুনর্বিন্যাস, নতুন জোট, ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্রের সক্রিয়তা।
বিএনপি, জামায়াত ও নতুন নাগরিক শক্তিগুলোর উত্থান রাজনীতিকে বহুমাত্রিক করছে, কিন্তু একই সাথে অনিশ্চয়তাও বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ক্ষমতা কি সত্যিই জনগণের কাছে ফিরছে, নাকি শুধু হাতবদল হচ্ছে?
২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি দৃশ্যত পুনরুদ্ধারের পথে। প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে ফিরছে, রেমিট্যান্স ও রফতানি স্থিতিশীল হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট কিছুটা কমেছে। কিন্তু এই পুনরুদ্ধার এখনো ভঙ্গুর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণচাপ, রাজস্ব দুর্বলতা ও বৈষম্য অর্থনীতির ভেতরের ক্ষতগুলোকে স্পষ্ট করে রেখেছে।
মূল প্রশ্ন হলো– এই অর্থনীতি কি আগের মতো ভোগনির্ভর ও ঋণনির্ভর পথেই হাঁটবে, নাকি উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ ও ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনের দিকে অগ্রসর হবে? ২০২৬ সাল সেই দিকনির্দেশ নির্ধারণের বছর।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ একটি স্পষ্ট কৌশলগত চাপে রয়েছে। ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ একদিকে গুরুত্বপূর্ণ, অন্য দিকে ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ এখন ‘কারো সাথে শত্রুতা নয়’ নীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে, ভারসাম্যপূর্ণ, স্বার্থভিত্তিক ও সার্বভৌম কূটনীতির পথে। কিন্তু অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রোহিঙ্গা সঙ্কট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতা এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে নাজুক করে তুলছে।
২০২৬ সাল নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ নিজস্ব কৌশলগত সত্তা হিসেবে দাঁড়াতে পারবে, নাকি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ভেতর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
সাংস্কৃতিকভাবে ২০২৬ সাল এক ধরনের পুনর্জাগরণের সময়। সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত ও ডিজিটাল পরিসরে দীর্ঘদিনের দমন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ভাঙার চেষ্টা চলছে। জুলাই আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাষা তৈরি করেছে। তবে এই মুক্তির সাথে সাথে দেখা দিচ্ছে পরিচয়ের দ্বন্দ্ব, ধর্ম ও মুক্তচিন্তা, রাষ্ট্রীয় বয়ান ও জনসংস্কৃতি, মূলধারা ও প্রান্তিক কণ্ঠের টানাপড়েন। প্রশ্ন হলো, এই সংস্কৃতি কি বহুমাত্রিক ও সহনশীল পথে এগোবে, নাকি নতুন মেরুকরণে আটকে পড়বে?
চারটি ক্ষেত্র মিলিয়ে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি সিদ্ধান্তমূলক বছর। এটি নির্ধারণ করবে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ইতিহাসের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল, নাকি একটি নতুন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক চুক্তির সূচনা।
অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কৌশলগত ভারসাম্য ও সাংস্কৃতিক মুক্তি– এই চার স্তম্ভ একসাথে শক্ত না হলে পরিবর্তন টেকসই হবে না। ২০২৬ সাল তাই শুধু ভবিষ্যতের পূর্বাভাস নয়; এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয় পুনর্নির্ধারণের সময়।



