বাজেট আলোচনায় নাহিদ ইসলাম

ঋণখেলাপী ও গণহত্যাকারীদের অপরাধ আমি ভিন্নভাবে দেখি না

সংসদ প্রতিবেদক জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারকে উদ্দেশ করে তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কারের দাবি তুলে ধরেছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক

Location :

Dhaka City
বাজেট আলোচনায় সংসদে নাহিদ ইসলাম
বাজেট আলোচনায় সংসদে নাহিদ ইসলাম |নয়া দিগন্ত

সংসদ প্রতিবেদক জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারকে উদ্দেশ করে তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কারের দাবি তুলে ধরেছেন।

বক্তব্যের শুরুতেই নাহিদ ইসলাম বলেন, ঋণখেলাপী ও গণহত্যাকারীদের অপরাধ আমি ভিন্নভাবে দেখি না। একসময় যারা রিকশায় চড়তেন, এখন তারা প্রাডোতে চড়েন—বিএনপি দলীয় এক এমপির বক্তব্যের রেশ ধরে তিনি অভিযোগ করেন, জেলে থাকা অবস্থায়ও বর্তমান সরকার দলীয় অনেক নেতার সম্পদ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি দাবি করেন, যারা একসময় ধান ও পাটক্ষেতে পালিয়ে ছিলেন, তাদের প্রকৃত সম্পদের হিসাব স্থানীয় মানুষই জানেন।

রোববার রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৭তম দিনে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

নাহিদ ইসলাম ‘জুলাই অভ্যুত্থান জাদুঘর’ প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সরকারি দলের কেউ কেউ জুলাই অভ্যুত্থান জাদুঘর চালু হোক চান না শুনি। ৫ আগস্টের মধ্যে এই জাদুঘর চালু করার কথা ছিল এবং তা বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে তিনি গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার দাবি জানান।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সীমান্তে ‘পুশিং’ ইস্যু নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে চাইলেও তা আটকে দেয়া হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে কার্যকর সংসদীয় আলোচনা না হওয়াকে তিনি উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন।

বিদেশনীতি প্রসঙ্গে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের আকাশ-জমিন এক করে ফেলেছেন। মিষ্টি কথায় চিড়ে ভিজে না। গত ১৬ বছরের ভারতের সাথে অতীত টেনে বলেন, সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে।

তিনি বাংলাদেশের তরুণদের কাজে লাগানো, প্রশিক্ষণ দেয়া এবং বিদেশে দক্ষ কর্মী হিসেবে পাঠানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সাথে ইসলামী ব্যাংক দখলসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন।

নাহিদ ইসলাম সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে ঘাটতি ও অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন।

তার মতে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনযোগ্য নয় এবং সরকার ‘স্বপ্নবিলাসী’ পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতি পরিচালনার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, অর্থনীতি আবেগ দিয়ে চালানো যায় না; বরং উৎপাদন, বণ্টন, ভোগ ও বিনিয়োগের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা বর্তমান বাজেটে অনুপস্থিত।

২০০৮ সালের পর দীর্ঘ ১৬ বছরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই সময়কালে দলীয়করণ, সিন্ডিকেট ব্যবস্থা এবং অলিগার্ক শ্রেণির উত্থান ঘটেছে, যার ফলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাট এবং হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের ঘটনা ঘটেছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটকে তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

বক্তব্যে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ কেবল সরকারি চাকরিতে নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল। তিনি বলেন, এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে নগদ অর্থ গেলে তা মূলত ভোগে ব্যয় হয়, যা অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলে না। এই সময়ে প্রয়োজন ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করা।

ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ঋণখেলাপিদের আবারও সুযোগ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কেবল বিদ্যমান আইনে সমাধান সম্ভব নয়।

নাহিদ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থার সম্পৃক্ততায় ব্যাংক দখলের ঘটনাও ঘটেছে, যা নতুন আইনি কাঠামো ছাড়া সমাধানযোগ্য নয়।

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি আদানি ও অন্যান্য বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান।

প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য খাত নিয়েও তিনি বাজেটে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং constitutional (সাংবিধানিক) সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকর হবে না। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

নাহিদ ইসলাম সীমান্ত পরিস্থিতি ও হত্যাকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সংসদে এসব বিষয়ে আলোচনা না হওয়ার সমালোচনা করেন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শক্ত অবস্থান প্রত্যাশা করেন।

তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একাধিক রাজনৈতিক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে, যার জবাব রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের ভূমিকা নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন, অতীত সম্পর্কের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান ও ব্যাখ্যা থাকা উচিত বলে উল্লেখ করেন।