আল জাজিরার প্রতিবেদন

নির্বাচনী অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো?

দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ ও প্রচারণায় প্রার্থীরা তুলে ধরছেন পরিচিত উদ্বেগগুলো—চাকরি, মূল্যস্ফীতি, কর ছাড়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
এনসিপি আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরা এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালান
এনসিপি আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরা এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালান |সংগৃহীত

২৭ বছর বয়সী মোহাইমিনুল রাফি কয়েক বছর ধরে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার ভাষায়, এটি “নিরাপদ জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ”—প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি।

দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ায় রাফির মতো তরুণদের লক্ষ্য করেই এখন রাজনৈতিক দলগুলো দিচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি—বেকারদের জন্য নগদ সহায়তা, সুদমুক্ত ঋণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের আশ্বাস।

নগদ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণ প্রসঙ্গে রাফি বলেন, “অবশ্যই উপকার হবে। কিন্তু সত্যি বলতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি স্বাস্থ্যকর চাকরির বাজার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ।”

২০২৪ সালে চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে অংশ নেয়া তরুণদের একজন ছিলেন রাফি। সেই আন্দোলন পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়।

এ প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা।

দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ ও প্রচারণায় প্রার্থীরা তুলে ধরছেন পরিচিত উদ্বেগগুলো—চাকরি, মূল্যস্ফীতি, কর ছাড়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান।

তবে বিশ্লেষক ও ভোটারদের মতে, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসব প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাস্তবায়ন করা যেকোনো সরকারের জন্যই কঠিন হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমে ৪–৫ শতাংশে নেমেছে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, আর মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদ হোসাইন জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু স্থিতিশীলতা আনলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, নির্বাচন অনিশ্চয়তা কমাতে পারে, তবে নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

কল্যাণ কার্ডের রাজনীতি

বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৪০ লাখ পরিবারকে মাসে ২,০০০–২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, দেশব্যাপী বাস্তবায়ন হলে বছরে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন টাকা প্রয়োজন হবে—যা বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাব ‘স্মার্ট সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’, যার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা একীভূত করার কথা বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ।

তরুণদের চাকরির প্রতিশ্রুতি

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩.৫ শতাংশ। বিএনপি ১৮ মাসে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে ৮ লাখ কর্মসংস্থানের কথা বলেছে।

জামায়াত পাঁচ বছরে ১ কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, ৫০ লাখ চাকরির সংযোগ এবং সুদমুক্ত মাসিক ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের কর্মসংস্থান বাস্তবায়নে ৮–১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

কর, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

জামায়াত করপোরেট কর ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বিএনপি নির্দিষ্ট হার উল্লেখ না করে ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের কথা বলছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উভয় দলই বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার ছাড়া এসব বাস্তবায়ন টেকসই হবে না।

রাফির মতো তরুণদের কাছে প্রতিশ্রুতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি আদৌ বদলাবে কি না।

রাফির কথায়, “প্রতিশ্রুতি দেয়া সহজ। কিন্তু ব্যবসায় চাঁদা আর চাকরিতে ঘুষের সংস্কৃতি না বদলালে আমরা আবার শুরুর জায়গাতেই ফিরে যাব।”

সূত্র: আল জাজিরা।