ইরান যুদ্ধে চাপে দেশের শ্রমবাজার : সংসদে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী

বিশ্বের ১৭৬টি দেশে ১ কোটি ৫৫ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মী কর্মরত রয়েছেন। তাদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ২৭টি দেশে ৩০টি শ্রম কল্যাণ উইং কাজ করছে। পাশাপাশি ১১টি মিশনে ‘ল’ ফার্ম বা প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আইনি সহায়তা জোরদার করা হয়েছে।

সংসদ প্রতিবেদক

বিশ্বের ১৭৬টি দেশে ছড়িয়ে থাকা দেড় কোটির বেশি বাংলাদেশী কর্মীর কল্যাণ, অধিকার সুরক্ষা ও নতুন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু শ্রমবাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হলেও, তা কাটিয়ে উঠতে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সরকার।

রোববার ( ৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের অষ্টম দিনে বিভিন্ন লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী মো. আরিফুল হক চৌধুরী এসব তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজার প্রশ্নের জবাবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে ১ কোটি ৫৫ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মী কর্মরত রয়েছেন। তাদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ২৭টি দেশে ৩০টি শ্রম কল্যাণ উইং কাজ করছে। পাশাপাশি ১১টি মিশনে ‘ল’ ফার্ম বা প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আইনি সহায়তা জোরদার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রবাসী কর্মীদের পাসপোর্ট জটিলতায় ট্রাভেল পাস প্রদান, বিদেশে আটক কর্মীদের আইনি সহায়তা ও মুক্তির ব্যবস্থা এবং নারী কর্মীদের জন্য বিভিন্ন দেশে ‘সেফ হোম’ পরিচালনা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা দুর্যোগে আটকে পড়া কর্মীদের দেশে ফেরাতেও বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ইরান থেকে বাংলাদেশী কর্মীদের আর্থিক সহায়তায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ফ্রি ওয়াইফাই, টেলিফোন, সংবাদপত্র এবং ‘প্রবাসী ক্যাফে’তে ৩০ শতাংশ ছাড়ে খাবারের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। অসুস্থ বা মৃত কর্মী পরিবহনে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

আর্থিক সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রী জানান, প্রবাসে মৃত কর্মীর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা অনুদান এবং দাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে। অসুস্থ কর্মীদের চিকিৎসা সহায়তা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া প্রবাসীদের মেধাবী সন্তানদের এইচএসসি ও স্নাতক পর্যায়ে বৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী সন্তানদের ভাতা ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২ লাখ ৪৩ হাজার বিদেশফেরত কর্মীকে পুনর্বাসনে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে ‘প্রবাস কল সেন্টার’। এছাড়া প্রতিটি জেলায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে Expatriate Help Cell চালুর মাধ্যমে প্রবাসীদের সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আলফারুক আব্দুল লতীফের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরো জানান, ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জন বাংলাদেশী কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন, যার মধ্যে নারী কর্মী ৬২ হাজার ৩৫২ জন।

শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো সঙ্কুচিত বাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, রোমানিয়া, সিসেলস, পর্তুগাল ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত কর্মী পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৮টি দেশের সঙ্গে কর্মী প্রেরণে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

জাপানের শ্রমবাজারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ‘জাপান সেল’ গঠন এবং জাপানি ভাষায় দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘আইএম জাপান’-এর আওতায় বিনা অভিবাসন ব্যয়ে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন পাঠানো হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ‘স্পেশালাইজড স্কিলড ওয়ার্কার’ পাঠানোর ক্ষেত্রে নবম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

দক্ষতা উন্নয়নে দেশজুড়ে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ৬টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজিতে ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ১ লাখ ড্রাইভার তৈরির লক্ষ্যে বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে জাপানিজ, কোরিয়ান, ইংরেজি, চাইনিজ, আরবি, ইতালিয়ান ও জার্মান ভাষায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবে কর্মী পাঠাতে ‘তাকামল’ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ২৯টি প্রতিষ্ঠানে ৭৯টি পেশায় স্কিল ভেরিফিকেশন চালু হয়েছে। এ সনদ নিয়ে কর্মীরা সৌদি আরবে যাচ্ছেন।

সরকারি রিক্রুটিং সংস্থা ‘বোয়েসেল’-এর মাধ্যমে জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিজি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্বল্প বা শূন্য খরচে কর্মী পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. সফিকুর রহমান (কিরন)-এর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শ্রমবাজারে কর্মী প্রেরণ ব্যাহত হচ্ছে বলে স্বীকার করেন মন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারণে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।