জ্বালানি চাপে বাংলাদেশ

‘দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বর্তমান সঙ্কটকে আরো তীব্র করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে খনন হয়েছে মাত্র আটটি। এর ফলে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।’

আশরাফুল ইসলাম
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত |নয়া দিগন্ত

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি অভিঘাতে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নতুন করে গভীর চাপে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দামের অস্বাভাবিক উল্লম্ফনে দেশের আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের হিসাবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতি মাসে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৭৬০ থেকে ৮৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সরকারি ভর্তুকি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠক ও ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার বহুমুখী কৌশল নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি, তেলের মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তুতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং কৃষিখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রভাবে মাত্র চার সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২২.৫১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি বাংলাদেশের আমদানি বিলকে ভারী করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যদি দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে স্থিত থাকে, তাহলে বাংলাদেশ একধরনের ‘জ্বালানিনির্ভর আর্থিক জরুরি অবস্থা’-এর মুখে পড়তে পারে। বিদ্যুৎ খাতেও সঙ্কটের একটি কাঠামোগত দিক রয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও এর প্রায় ৬৩ শতাংশ অলস পড়ে থাকে। উৎপাদন না করেও এসব কেন্দ্রকে বছরে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে, যা আর্থিক চাপকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ ও খুচরা বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ১৮ থেকে ২২ টাকা হলেও খুচরা মূল্য তার চেয়ে অনেক কম। ফলে প্রতি মাসে ভর্তুকির চাপ বেড়ে সাত হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে; যা আগের থেকে দ্বিগুণেরও বেশি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বর্তমান সঙ্কটকে আরো তীব্র করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে খনন হয়েছে মাত্র আটটি। এর ফলে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, স্পট মার্কেট থেকে মাত্র এক মাসের এলএনজি আমদানিতে যে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, সেই অর্থ দিয়ে দেশে ১৫ থেকে ২০টি গ্যাস কূপ খনন সম্ভব। এসব কূপ থেকে অন্তত ১৫ বছর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেত, যা দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারত। বিশ্লেষকদের হিসাবে দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত এক কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা গেলে বছরে প্রায় আট কোটি ২০ লাখ ডলার সাশ্রয় সম্ভব।

তবে সরকার তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ দেখছে না। জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব ও মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ডিজেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ তার তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে এক লাখ ৩৩ হাজার টন ডিজেল মজুদ আছে। পাশাপাশি ৩০ মার্চ ও ৩ এপ্রিল আরো ৫৪ হাজার ৬০০ টন জ্বালানি তেল আসার কথা রয়েছে। এপ্রিলজুড়ে মালয়েশিয়া ও অন্যান্য উৎস থেকে আরো এক লাখ ৫৪ হাজার টন তেল আমদানি হবে।

সরকার বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়াতে বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে ২২ হাজার টন ডিজেল এসেছে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাশিয়া থেকে দুই মাসের জন্য ছয় লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ কমাতে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে পেট্রল ও অকটেনচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হতে পারে। সরকারের মতে, এতে আতঙ্কজনিত চাহিদা কমবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা আরো নিয়ন্ত্রিত হবে।

এ দিকে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় রয়েছে। সরকারি বিপণন সংস্থাগুলো থেকে প্রস্তাব জমা পড়েছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান মূল্য বজায় রাখলে ভর্তুকি কত বাড়বে এবং প্রতি লিটারে দুই টাকা থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ালে কতটা চাপ কমবে– সেসব হিসাব-নিকাশ চলছে। এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে সঙ্কট মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রায় ৯ টাকা, যেখানে হেভি ফুয়েল অয়েলে তা ২৬ টাকা এবং ডিজেলে ৩২ টাকার বেশি। বর্তমানে দেশে পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌর প্রকল্প নীতিগত জটিলতায় আটকে আছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে ১৫ বিলিয়ন থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা শিল্পখাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল ও সিরামিক খাতে ওয়েস্ট হিট ব্যবহার করলে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব, যা একাধিক নতুন গ্যাস কূপের সমপরিমাণ উৎপাদনের সমান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো জ্বালানি সঙ্কট নেই। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির বিষয়ে সরকার কাজ করছে।’ তিনি আরো জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরান থেকে ১৮৬ জন বাংলাদেশীকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল স্বল্পমেয়াদি আমদানি ব্যয়ের সঙ্কট নয়; এটি দেশের জ্বালানি নীতি, দেশীয় অনুসন্ধান, ভর্তুকি কাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের সক্ষমতার একটি কঠিন পরীক্ষা। তাদের সতর্কবার্তাÑ প্রতিটি মাসের বিলম্ব দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এখনই দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত না নিলে সামনে সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।