ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই আসামি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখ ভারতে পালিয়ে প্রথমে দেশটির মেঘালয় রাজ্যে আশ্রয় নেন।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো: নজরুল ইসলাম।
এর আগে পুলিশের কর্মকর্তারা বলে আসছিলেন, ওই প্রধান আসামিদের অবস্থান সম্পর্কের তাদের জানা নেই।
আজ সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানিয়েছে, ওসমান হাদির হত্যার ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত। শুটারকে ভারতে পালাতে সহায়তাকারীসহ মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছয়জনের স্বাকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
মো: নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের দেয়া তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার দিনই শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাকে সহায়তাকারী মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখকে সনাক্ত করে পুলিশ।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, ফয়সালের বাবা হুমায়ূন কবির, ফয়সালের মা হাসি বেগম, স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, মো: কবির, নুরুজ্জামান নোমানীসহ মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এই ঘটনায় ব্যবহৃত দু’টি বিদেশী পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলি, ম্যাগজিন ও ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। মোটরসাইকেল ও ভুয়া নম্বর প্লেট, গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ৫৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ২১৮ কোটি টাকার সাক্ষরিত চেক উদ্ধার করেছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন, গ্রেফতারদের দেয়া জবানবন্দি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফয়সাল ও আলমগীর ঘটনার পরপরই ঢাকা হতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আমিন বাজারে যায়। পরে তারা মানিকগঞ্জের কালামপুর যায়।
পুলিশের দাবি, সেখান থেকে একটি প্রাইভেটকারে চড়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছে। ঘটনাটি তাদের পূর্ব পরিকল্পিত ছিল। এ জন্য আসামিদের চিহ্নিত করার আগেই তারা সীমান্ত পাড়ি দেয়।
পরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের আগেই একটি ফিলিং স্টেশনে ফিলিপ ও সঞ্চয় নামের দু’জন তাদের গ্রহণের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। ফিলিপ তাকে সীমান্ত পাড় করে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে জনৈক পুত্তির কাছে হস্তান্তর করেছে। পুত্তি তাকে সামি নামের একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে হস্তান্তর করে। সামী মেঘালয় রাজ্যের তুরা নামক শহরে তাদেরকে পৌঁছে দেয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানায় ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার।
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইনফরমাল চ্যানেলে মেঘালয় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করি। তারা ইতোমধ্যে পুত্তি ও সামীকে গ্রেফতার করেছে। ছয়জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ও চারজন স্বাক্ষী ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।’
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে পল্টন থানার বক্স কালভার্ট রোডে হামলার শিকার হন শরিফ ওসমান হাদি। মতিঝিল মসজিদ থেকে জুমার নামাজ শেষে প্রচারণা চালিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলে আসা প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ রাহুল দাউদ ও তার অজ্ঞাত পরিচয়ের সহযোগী হাদিকে লক্ষ্য করে চলন্ত অবস্থায় গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় ওসমান হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।
সেখানে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে শাহাদাতবরণ করেন। এ ঘটনায় গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। মামলায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, হত্যাচেষ্টা ও বিপজ্জনক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।
তবে হাদির মৃত্যুর পর গত ২০ ডিসেম্বর আদালতের আদেশে মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা) সংযোজনের আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ।



