চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে ব্যাখ্যা দিলেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা

সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন গণমাধ্যমে প্রকাশিত চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সংবাদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, আইন অনুযায়ী বিদেশে চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করে এবং সব ব্যয়ের রসিদ ও নথি তিনি যথাযথভাবে জমা দিয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন |ফাইল ছবি

গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিজের চিকিৎসা ব্যয়-সংক্রান্ত খবরের তীব্র নিন্দা ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক বিষয়গুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফ্রেমিং করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

আজ রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া পোস্টে সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা এই ব্যাখ্যা দেন।

ফেসবুকে তিনি লেখেন, আমি উপদেষ্টা হিসেবে সততা ও নিষ্ঠার সাথে এবং নির্লোভ ও নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সরকারি কোনো অর্থ আত্মসাৎ কিংবা তসরুপ করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি। আইনমতে, যতটুকু আমার প্রাপ্য তাও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছি। কিন্তু কিছু মিডিয়া বৈধ, নিয়মতান্ত্রিক ও আইনগত বিষয়গুলোকে এমনভাবে ফ্রেমিং করছে যেন জনমানসের মনে শঙ্কা ও সন্দেহ তৈরি হয়। আমি এসব সংবাদ ও মিডিয়া ফ্রেমিংয়ের তীব্র নিন্দা জানাই। আল্লাহ তা’য়ালা সবাইকে সহি বুঝ দান করুন।

তিনি লেখেন, গতকাল কয়েকটা অনলাইন মিডিয়া পোর্টালে আমার উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকাবস্থায় চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সংবাদ আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উপর্যুক্ত সংবাদের মিডিয়া ফ্রেমিং নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ফলে আমার যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদান জরুরি বলে মনে করি।

ফেসবুকে দেয়া তার ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো-

১। চিকিৎসা ব্যয়: বাংলাদেশে মন্ত্রীদের চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি ‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রিমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এই আইনের আওতায় মন্ত্রিসভার সদস্যরা দেশ বা বিদেশে যে কোনো স্থানে চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ সরকারি কোষাগার থেকে পেয়ে থাকেন।

২। বিদেশে চিকিৎসার নিয়ম: মন্ত্রীদের বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া ও নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।

মেডিক্যাল বোর্ডের সুপারিশ: কোনো মন্ত্রী যদি বিদেশে চিকিৎসা নিতে চান, তবে প্রথমে দেশের একটি উপযুক্ত মেডিক্যাল বোর্ডগঠন করা হয়। সেই বোর্ডের চিকিৎসকেরা যদি প্রত্যয়ন করেন যে সংশ্লিষ্ট রোগের প্রয়োজনীয় বা উপযুক্ত চিকিৎসা দেশে সম্ভব নয়, কেবল তখনই বিদেশে চিকিৎসার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।

সরকার প্রধানের অনুমোদন: মেডিক্যাল বোর্ডের সুপারিশের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা উপদেষ্টার বিদেশে যাওয়ার জন্য সরকার প্রধানের চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হয়।

বিল বা ভাউচার পেশ: বিদেশে চিকিৎসা শেষ করে দেশে ফেরার পর খরচের প্রকৃত রসিদ, ভাউচার ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যাচাই-বাছাই শেষে সেই বিল সরকারিভাবে পরিশোধ বা সমন্বয় করে।

৩। আমার অবস্থান: আমি মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে বিগত সরকারে নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। ফলে দেশে ও বিদেশে আমার চিকিৎসা ব্যয় আইননুসারে সরকার বহন করবে।

৪। আমার শারীরিক অবস্থা: আমি দীর্ঘদিন যাবত জটিল হৃদরোগে আক্রান্ত। সেইসাথে হাই ডায়াবেটিস (দিনে তিনবার ইনসুলিন নিই), উচ্চ রক্তচাপ, ও নানাবিধ স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছি। ২০১৫ সালে আমার হার্টে স্টেন্ট (রিং) বসানো হয়। এ যাবত পাঁচবার আমার এনজিওগ্রাম করা হয়। উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি হৃদরোগে আক্রান্ত হই এবং দেশের সরকারি মেডিক্যাল ও প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাগ্রহণ ও ডায়াগনোসিস করি। রিপোর্টে দেখা যায় আমার হৃদস্পন্দন অনিয়মিত (Atrial Fibrillation / AFib)। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের বোর্ড গঠন করা হয়। লিখিতভাবে আমাকে জানানো হয় ‘ক্যাথেটার এবলেশন’ নামক একটা জটিল অপারেশন করা আবশ্যক এবং এই অপারেশন করার মতো অত্যাধুনিক লেটেস্ট মেশিন ও প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি দেশে নেই। ফলশ্রুতিতে আবুধাবিতে অবস্থিত একটি মার্কিন হাসপাতাল, ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাড হাসপাতালে চিকিৎসার পরামর্শ দেয়া হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যারেথমিয়া বিশেষজ্ঞ ও সার্জন রয়েছেন।

৫। বিদেশে আমার চিকিৎসা ব্যয়: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে আমি থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাড হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাই। সেখানে আবারো আমার এনজিওগ্রাম করানো হয় এবং ডায়াগনোসিস করে অপারেশন করার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায় আমার হৃদপিণ্ডের দেয়ালে জমাট রক্তকণা লেগে আছে। চিকিৎসক জানালেন প্রথমে চিকিৎসার মাধমে এটা অপসারণ করতে হবে; এর পর অপারেশন। অপারেশন না করালে রক্তজমাট বেঁধে ব্রেইন স্ট্রোক ও হার্ট ফেল করার আশঙ্কা আছে। এদিকে পবিত্র হজের সময়ও নিকটবর্তী। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হজের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে আমি দেশে ফিরে আসি। এটুক পর্যন্ত আমার চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ১৭ লাখ টাকা। যার প্রতিটা ব্যয়ের রশিদ ও ভাউচার আমি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছি।

৬। অপারেশন ব্যয়: পবিত্র হজের দায়িত্ব পালন শেষে আবারো অসুস্থতা অনুভব করায় আমি দেশের ডাক্তারদের শরণাপন্ন হই এবং তারা দ্রুত অপারেশনের পরামর্শ প্রদান করেন। বিগত জানুয়ারি মাসে আমার অপারেশন সম্পন্ন হয় এবং বামুনগ্রাড হাসপাতালে বিল দিই প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। যদিও বিল আরো বেশি আসে, কিন্তু থাইল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুরোধে কিছু ডিস্কাউন্ট পাওয়া যায়। আমি বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে কৃতজ্ঞ। এ সংক্রান্ত সমস্ত বিলের কপি আমি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে জমা করি।

৭। সরকার কর্তৃক বিল প্রদান: আইননুসারে সরকার কর্তৃক মন্ত্রী/উপদেষ্টার চিকিৎসার সমস্ত খরচ সরকার বহন করবে। সরকার শুধুমাত্র আমার হাসপাতালের বিল, অপারেশন বিল ও মেডিসিনের ব্যয় বহন করেছে। প্রকৃতপক্ষে আমার পরিচর্যার জন্য সাথে যাওয়া আমার সহযাত্রীর সমস্ত খরচ আমি বহন করেছি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার হোটেলে বসবাসের বিল, খাওয়ার বিল, যাতায়াত খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছি। সরকার প্রদত্ত প্রতিটি পয়সার প্রকৃত বিল, ভাউচার, রিসিপ্ট আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। যে কেউই চাইলে হাসপাতাল ও কর্তৃপক্ষের কাছে এসব ব্যয়ের ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করতে পারবেন।