খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে শোকার্ত বাংলাদেশ

আপসহীন রাষ্ট্রনায়কের বিদায়

আজ জানাজা শেষে জিয়ার কবরের পাশে দাফন

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; আর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুইবার। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে নাম লেখানো খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কেটেছে রাজপথের আন্দোলনে। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; তবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো তিনি হারেননি।

মঈন উদ্দিন খান
গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করার পর সাংবাদিকদের সামনে কথা বলছেন খালেদা জিয়া
গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করার পর সাংবাদিকদের সামনে কথা বলছেন খালেদা জিয়া |ফাইলফটো

নিভে গেল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, আপসহীন উপাধিতে ভূষিত চিরসংগ্রামী ও খাঁটি দেশপ্রেমিক কিংবদন্তিতুল্য রাষ্ট্রনায়ক বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জীবনপ্রদীপ। গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশী-বিদেশী চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বেগম জিয়ার এই মৃত্যুর খবর ভোরের কনকনে শীত আর কুয়াশা ভেদ করেই ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুতের গতিতে। মানুষ যে যেখানে ছিল সেখানেই যেন দাঁড়িয়ে যায়, থেমে যায় সব কোলাহল। হাসপাতালের ভিতরে-বাইরে পড়ে কান্নার রোল। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশ।

সাবেক তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আজ সাধারণ ছুটিসহ ঘোষণা করা হয়েছে তিন দিনের জাতীয় শোক। বেগম জিয়াকে যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করতে সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আজ বুধবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বেলা ২টায় অনুষ্ঠিত হবে। বিকেল সাড়ে ৩টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হবে জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; আর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুইবার। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে নাম লেখানো খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কেটেছে রাজপথের আন্দোলনে। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; তবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো তিনি হারেননি।

লিভার সংক্রান্ত জটিলতা, কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও ইনফেকশনজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছিলেন ৮০ বছর বয়সী বেগম খালেদা জিয়া। গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি বসুন্ধরায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তার বড় ছেলে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং পরিবারের সদস্যরা সোমবার গভীর রাতে হাসপাতালে ছুটে যান। রাত ২টার পর এ জেড এম জাহিদ হোসেন হাসপাতালের সামনে এসে সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া ‘অত্যন্ত সঙ্কটময়’ সময় অতিক্রম করছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তার সুস্থতার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দেশবাসীকে দোয়া করার আহ্বান জানাচ্ছি। এর কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিএনপি চেয়ারপারসনকে মৃত ঘোষণা করেন। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, তারেকের স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার মরহুম ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান, দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান, জাফিয়া রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, মরহুম সাইদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দার, খালেদা জিয়ার মেজো বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সময় হাসপাতালে ছিলেন।

বেগম জিয়ার মৃত্যুর খবরে তাৎক্ষণিকভাবে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্সদের অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। এই শোকসংবাদ মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই শোক প্রকাশ করে পোস্ট দেন। বিএনপি নেতাকর্মী আর সমর্থকরা জড়ো হতে থাকেন এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে। পরে সকাল ৯টায় খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার সাংবাদিকদের সামনে এসে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘দীর্ঘ এক মাস ১০ দিন বিভিন্ন চিকিৎসা করে উনাকে সুস্থ করার জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, বাট আমি মেডিক্যাল বোর্ডের পক্ষ থেকে আজ ভোর ৬টায় উনাকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণা করেছিলাম। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে উনার জন্য দোয়া চাই। আপনারা দোয়া করবেন, উনি যেন বেহেশতবাসী হোন।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সময় বলেন, ‘এই সংবাদটি নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে হবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি। এই শোক, এই ক্ষতি এটা অস্বাভাবিক, অপূরণীয়। এই জাতি কোনো দিন পূরণ করতে পারবে না।’ মির্জা ফখরুল বলেন, তাদের নেত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ফোন করেছিলেন।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে জানিয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সব কার্যালয়ে সাত দিন কালো পতাকা উত্তোলন থাকবে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এই সাত দিনব্যাপী কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। প্রতিটি দলীয় কার্যালয় দেশনেত্রীর জন্য সাত দিনব্যাপী কুরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ও গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে এবং জেলাপর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।

গৃহবধূ থেকে ক্ষমতার চূড়ায়

খালেদা জিয়ার জন্ম অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে, ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনীতে হলেও তিনি জলপাইগুড়িতে বোনের বাসায় থেকে পড়ালেখা করেন। পরে সেখানে চা ব্যবসায় জড়ান ইস্কান্দার। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর খালেদা জিয়ার পরিবার বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানে মিশনারি স্কুলে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন খালেদা। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে খালেদার বিয়ে হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বহু প্রতীক্ষিত সংসদ নির্বাচনে জীবনে প্রথমবার ভোট করেন খালেদা জিয়া। পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচটিতেই বিজয়ী হন। আর বিএনপি এ নির্বাচনে সংসদের বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। এরপর ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি করে আসনে ভোট করে সব ক’টিতেই জয় পান খালেদা জিয়া। তিনি সবশেষ নির্বাচন করেছেন ২০০৮ সালে, সেবারও তিন আসনের সব ক’টিতে বিজয়ী হন। মাঝে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধিকাংশ দলের বর্জনে এক তরফা নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও সেই সরকারের মেয়াদ ছিল এক মাসেরও কম। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সাথে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া ফের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান। এক বছর পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান বিএনপি চেয়ারপারসন। তারেকও মুক্তি পেয়ে লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। জিয়া-খালেদা দম্পতির আরেক সন্তান আরাফাত রহমান কোকো যান এক দশক আগেই।

জরুরি অবস্থার মধ্যে খালেদা জিয়া যখন গ্রেফতার হয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনাও কাছাকাছি সময়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিনি মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ গেলেও খালেদা জিয়া যেতে অস্বীকৃতি জানান।

তিনি সে সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এটাই আমার ঠিকানা। এ দেশ এ দেশের মাটি মানুষই আমার সব কিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাবো না।’

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিও তাকে দুর্নীতির অভিযোগে জেলে পাঠানো হয়েছিল। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ অনেকটা আকস্মিকভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয় খালেদা জিয়াকে। শর্তানুযায়ী তাকে থাকতে হয় গুলশানের বাসায়, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও তার ছিল না। ফলে মুক্তি পেয়েও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন একরকম বন্দিজীবন কাটতে থাকে বিএনপি চেয়ারপারসনের। এর মধ্যে কয়েকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কয়েক দফা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারও হয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওই বছর ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। পরে উচ্চ আদালত তাকে দুই মামলা থেকেও খালাস দেন। কিন্তু নানা ধরনের অসুস্থতা তাকে ততদিনে অনেকটাই কাবু করে ফেলেছে। মুক্তি মিললেও দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি আর সশরীরে অংশ নেননি। এর মধ্যে চলতি বছর জানুয়ারিতে লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আসেন খালেদা জিয়া। সেখানে বহু বছর পর বড় ছেলে তারেক রহমানের সাথে তার দেখা হয়। দেশে ফেরার পর কিছু দিন ভালোই ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করলে জানানো হয়, বগুড়া-৩, ফেনী-১ ও দিনাজপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচন করবেন খালেদা জিয়া। সবশেষ গত ২১ নভেম্বর ঢাকায় সেনাসদরের সেনাকুঞ্জে সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল খালেদা জিয়াকে। তার দুই দিনের মাথায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেয়ার কথা ভাবা হলেও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন ভেঙে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। সেদিনই তিনি হাসপাতালে যান মাকে দেখতে। গত সোমবার ছিল নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন। বিএনপির অন্যান্য প্রার্থীদের সাথে খালেদা জিয়ার নামেও তিন আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। তার পরদিনই তার মৃত্যুর খবর এলো।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক

বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর দুপুরে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রণে অংশ নেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠক শুরু হয় এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে। সভায় প্রধান উপদেষ্টা বেগম জিয়ার স্মৃতিচারণ করেন। এতে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজার সিদ্ধান্ত হয়।

সভা শেষে ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, গোটা জাতির মতো সরকারে যারা আছেন তারাও শোকাহত। উপদেষ্টা পরিষদের সভায় খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বুধবার থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। আজ বুধবার থাকবে সাধারণ ছুটি।

তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে বেগম জিয়ার অবদান অবিনশ্বর হয়ে থাকবে। এমন একজন নেত্রীর চলে যাওয়াটা একটি বিশেষ মুহূর্ত। সবাই শোকাহত। সবার উচিত জানাজা ও দাফনে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। উপদেষ্টা পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্বে বাংলাদেশের যত দূতাবাস ও হাইকমিশন আছে সেগুলোতে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকবই খোলা হবে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক

চেয়ারপারসনের মৃত্যুর পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জরুরি বৈঠকে বসে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই বৈঠক চলে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহ উদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ অংশ নেন।

বৈঠক শেষে বেলা পৌনে ৩টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা আজ বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজা পড়াবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব। পুরো জানাজা কার্যক্রমের সঞ্চালনা করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। সবাই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করবেন। তার দাফনে অংশ নেবেন।

বিএনপির কর্মসূচি

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাত দিনব্যাপী বিএনপি শোক পালন করবে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সব দলীয় কার্যালয়ে এসময় কালো পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবে। প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে কুরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ও নয়াপল্টনের বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এবং জেলাপর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।

কান্নার রোল নয়াপল্টনে

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হন নেতাকর্মীরা। প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে কান্নার রোল পড়ে যায় তাদের মধ্যে। অনেককেই হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে। অনেক নেতাকর্মী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করে তার ফাঁসি দাবি করেন।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদের পর থেকেই নয়াপল্টনে কুরআন খতম শুরু হয়। সকাল ১০টা থেকে দলীয় কার্যালয়ের নিচতলায় ওলামা দল কুরআন খতম শুরু করে। আজ বুধবার জানাজার পূর্ব পর্যন্ত কুরআন খতম চলবে। দলীয় কার্যালয়ে উত্তোলন করা হয়েছে কালো পতাকা।