দেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিরোধী দলের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সম্মিলিতভাবে অর্থনীতিকে এই সংকট থেকে উত্তরণ করা যায়।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দেশ বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। এতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে এবং আগামী সময়টা কঠিন হবে। অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যার কিছু হয়তো জনপ্রিয় না-ও হতে পারে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা- এমনকি আরো উন্নত করা সম্ভব, যদিও এর জন্য আগামী দুই বছরে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে বেশ কিছু সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকি উদ্যোগগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি একটি কঠিন চিত্র তুলে ধরেছি। তবে আশার কথা হচ্ছে, দেশ একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতার (প্রধানমন্ত্রী) নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, যার চিন্তা ও কর্মদক্ষতা আমাদের অনুপ্রাণিত করছে।’
কঠিন সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাহসী এবং কখনো কখনো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত ছাড়া সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদেরও জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এটি দেশ ও জনগণের স্বার্থে। নিম্নস্তরের অর্থনৈতিক ভারসাম্য থেকে উত্তরণে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
দেশের নেতৃত্ব সঠিক এবং ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারব না, তবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারব। এটি কঠিন কাজ, কিন্তু সম্ভব। এ জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টি সমর্থন করেন এবং এ নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘ঋণ পুনঃতফসিলকরণ বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের উদ্ভাবন নয়।’
তিনি বলেন, ‘ঋণ পুনঃতফসিল ব্যবসা ও ব্যাংকিং সংস্কৃতির অংশ। বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থার শুরু থেকেই এটি বিদ্যমান।’
তিনি বলেন, ‘মহামারী বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো পরিস্থিতিতে ব্যবসায় ক্ষতি হলে পুনঃতফসিল প্রয়োজন হয়। কোভিড-১৯-এর সময় ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতায়ও অনেক উদ্যোক্তা ক্ষতির মুখে পড়েন।’
অর্থমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অতীতে বিরোধী দলের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন। ১৭ বছর ধরে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করতে পারেননি।
ঋণ অনুমোদন হলেও তা বিতরণ করা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, অনেককে ব্যবসা বন্ধ করতে হয়েছে, কেউ আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ কারাগারে ছিলেন। ‘কারাগারে থেকে কি কেউ সহজে ঋণ পরিশোধ করতে পারে?’ তিনি প্রশ্ন তোলেন।
প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি একটি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি নয়। সাংবিধানিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করতে হবে।’
অর্থনৈতিক সূচক তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।’
তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার সময় এটি প্রায় ১০ শতাংশ ছিল।’
তিনি আরো জানান, দারিদ্র্য হার বেড়ে ২০২২ সালের ১৭.১৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ২৯.৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমেছে। এটি এখন প্রায় ৬ শতাংশ, যেখানে বিএনপির সময় ১৮ শতাংশের বেশি ছিল।
রফতানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত দুই দশক ধরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল, এখন তা কমে গেছে।’
তিনি আরো জানান, ‘মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ১৪.৫ শতাংশ নেতিবাচক হয়েছে, যা বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।’
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে এবং আরো ২০-৩০ হাজার কোটি টাকা যোগ করতে হতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি খাতে বকেয়া পরিশোধের চাপও রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকির চাপ আরো বেড়েছে। মার্চ থেকে জুন সময়ে অতিরিক্ত ১১ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রয়োজন হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে।’
তিনি কাঠামোগত সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং ব্যবসা সহজীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশ ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে পিছিয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সব সিদ্ধান্ত সংসদেই নিতে হবে এবং তা জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।’
বিরোধীদের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, ‘আগামী দুই বছর কঠিন হবে। কিছু অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এটি প্রথম নয়। অতীতেও আমরা এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছি এবং সফল হয়েছি। এবারো আমরা তা পারব।’
সূত্র : বাসস



