হজযাত্রীদের সাথে প্রতারণা

পালিয়ে যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশনে এজেন্সি মালিক আটক

হজক্যাম্পে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হজ এজেন্সির মালিক সাহাদাত ও তার স্ত্রী বেশ কয়েকজন হজযাত্রীর কাছে কান্নাকাটি করে ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছেন।

শাহেদ মতিউর রহমান

Location :

Dhaka City
হজযাত্রীদের কাছে ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছেন এজেন্সি মালিক সাহাদাত
হজযাত্রীদের কাছে ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছেন এজেন্সি মালিক সাহাদাত |নয়া দিগন্ত

হজযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার পরেও তাদেরকে হজে না পাঠিয়ে নিজেই পালিয়ে হজে যাওয়ার সময়ে আশকোনাস্থ হজক্যাস্পে স্থাপিত অস্থায়ী ইমিগ্রেশনে আটক হয়েছেন এক এজেন্সি মালিক। আজ বৃহস্পতিবার (২২ মে) দুপুরে তাকে আটক করে হজক্যাম্পেই পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

এ দিকে প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন হজযাত্রী যেকোনো মূল্যে এ বছরই হজে যাওয়ার জন্য হজ অফিসারের কাছে মৌখিকভাবে আবেদন করেছেন। তারা ঢাকা ফেরত না নিয়ে বরং হজে যাওয়ার জন্যই হজক্যাম্পে এসে অবস্থান করছেন। অবশ্য এজেন্সি মালিক হজযাত্রীদের ফাঁকি দিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে পারেন এমন আশঙ্কায় প্রতারণার শিকার ক্বারী মাওলানা আনোয়ার হোসেন গতকাল বুধবার রামপুরা থানায় সামস্ মির্জা ট্রাভেলস নামের এই হজ এসেন্সি মালিক মাওলানা সাহাদাত হোসেনের নামে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

আজ দুপুরে রাজধানীর আশকোনাস্থ হজক্যাম্পে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হজ এজেন্সির মালিক সাহাদাত ও তার স্ত্রী বেশ কয়েকজন হজযাত্রীর কাছে কান্নাকাটি করে ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছেন। হজের পরে দেশে এসে তাদের প্রত্যেকের টাকা ফেরত দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। কিন্তু প্রতারিত হজযাত্রীরা বলছেন, আমাদের টাকা ফেরত দিতে হবে আর তা না হলে এ বছরই আমাদের নিয়েই এজেন্সি মালিককে হজে যেতে হবে। কারণ আমরা অনেক আশা ভরসা নিয়ে কষ্ট করে টাকা জমা দিয়েছি।

প্রতারিত হজযাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সামস্ মির্জা ট্রাভেলসের মাধ্যমে চলতি ২০২৫ সালে হজে যাওয়ার জন্য তারা প্রত্যেকেই ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। এজেন্সি নিয়োজিত টিম লিডার এনামুল হকের মাধ্যমেই তারা এই টাকা এজেন্সির মালিকের কাছে জমা দিয়েছেন। প্রতারণার শিকার যারা হয়েছেন সেই তালিকায় আছেন বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারে কর্মরত ক্বারী মাওলানা আনোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের সাবেক অধ্যাপক মনোয়ারা বেগম।

হজক্যাম্পে ক্বারী আনোয়ার হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, অনেক আশা নিয়ে এবার আমি এবং আমার স্ত্রী হজে যাওয়ার জন্য দু’জনের ৯ লাখ ৬২ হাজার জমা দিয়েছি। আরো টাকা দেয়ার জন্য প্রস্তুতিও দিয়েছি। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরেন এজেন্সি মালিক আমাদের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করছেন না। বারবার আমরা ফোন দিলেও তিনি ফোনও ধরছেন না। তখনি আমাদের মনে সন্দেহ হয়েছে। পরে লোক মারফত জানতে পারি আজ বৃহস্পতিবার এজেন্সি মালিক নিজেই পালিয়ে যাওয়ার সব বন্তোবস্ত করেছেন। ফলে বাধ্য হয়েই আমি গতকাল বুধবার থানায় জিডি করেছি এবং হজক্যাম্পে এসে মৌখিকভাবে হজ অফিসারকে বিষয়টি জানিয়েছি। পরে আজ বৃহস্পতিবার আমি এবং প্রতারণার শিকার আরো বেশ কয়েকজন হজযাত্রী হজক্যাম্পে এসে অপেক্ষা করছি।

প্রতারণা করে এজেন্সি মালিক হজে যাওয়ার জন্য হজক্যাম্পে স্থাপিত ইমিগ্রেশন অফিসে এসে পার্সপোর্ট জমা দেয়ার পরই তাকে সনাক্ত করে আটক করেন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। তাদেরই একজন রফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের উপরের কর্মকর্তাগণ আগেই আমাদের কাছে এই এজেন্সি মালিকের নাম ও পাসপোর্ট নম্বর জানিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের কাছে পাসপোর্ট জমা দেয়ার পরেই তাকে আমরা আটক করে হজ অফিসারের কাছে সোপর্দ করি। এখন আমাদের স্যারেরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

হজ অফিস সূত্র জানায়, সামস্ মির্জা ট্রাভেলসের অফিস ঢাকার খিলগাঁওয়ে। হোল্ডিং নাম্বার ৪৫১/বি, তালতলা। তাদের লাইসেন্স নং ২০৩। এর আগে নানা অনিয়ম আর প্রতারণা অভিযোগে তাদের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। তবে এবার তারা অন্য একটি এজেন্সির নামে হজযাত্রী পাঠানোর জন্য হাজী ও মোটা অংকের টাকাও সংগ্রহ করেছে।

এ বিষয়ে হজ অফিসারের দায়িত্বে থাকা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব লোকমান হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা ফেরত কোনো সমাধান নয়। আমরা চেষ্টা করছি যাতে প্রতারণার শিকার প্রত্যেকজন হাজি এ বছরই হজে যেতে পারেন। তিনি বলেন এই এজেন্সির মালিক শুরু থেকেই আমাদেরকেও অসহযোগিতা করেছেন। গত দু’দিন ধরে ফোনেও তাকে পাচ্ছিলাম না। ফলে বাধ্য হয়েই আমরা ইমিগ্রেশনে মৌখিকভাবে জানিয়ে রেখেছিলাম। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় বাংলাদেশ বিমানের এই ফ্লাইটে সামস্ মির্জা ট্রাভেলসের মালিক সাহাদাত হোসেন অতি চতুরতার সাথে বলতে গেলে পালিয়েই হজে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পরে ইমিগ্রেশন পুলিশের কর্মকর্তাগণ তাকে সনাক্ত করে আটক করে নিয়ে এসেছেন। এখন সব ভুক্তভোগী সব হজযাত্রীদের হজযাত্রা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোথাও যেতে দেয়া হবে না।

অবশ্য নিজের ভুল ও চালাকির কথা স্বীকার করে সামস্ মির্জা ট্রাভেলসের মালিক মাওলানা সাহাদাত হোসেন নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেককে বলেন, আমি কাউকে রেখে একা একাই হজে যেতে চাইনি। তবে আমার সাথে আরো ২৫ জন হজযাত্রী আছেন। তাদেরকে নিয়েই আমি আজ দুপুরের ফ্লাইটে সৌদিতে চলে যেতে চেয়েছিলাম। তিনি আরো বলেন, এখন যারা অভিযোগ করছেন তাদেরকে না নিয়ে আমি পালিয়ে যাচ্ছি তারা আসলে কেউই আমাকে সব টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করেননি। ফলে আমি বাধ্য হয়েছি যারা পুরো টাকা ঠিক সময়ে পরিশোধ করেছেন এমন ২৫ জন হজযাত্রী নিয়েই আজ হজে যেতে। আর বাকিদের আগামী বছর নেয়ার কথা বলেছি।

Topics