বর্তমান সংসদকে তিনি বিশ্বের ইতিহাসে বিরল এক ‘ঐতিহাসিক সংসদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, এই সংসদের অনেক সদস্যই কারাগার, গুম, নির্বাসন ও নির্যাতনের মতো কঠিন অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এসেছেন। তার ভাষায়, ‘কেউ এসেছেন ফাঁসির মঞ্চের কনডেম সেল থেকে, কেউ এসেছেন আয়নাঘর থেকে’—যা দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী প্রতিফলন।
টানা ১৩ দিনের বিরতির পর পুনরায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি।
রোববার (২৯ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে বৈঠক পরিচালিত হয়। অধিবেশনের শুরুতে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে কায়সার কামাল বলেন, সংসদের প্রতিটি সদস্যের অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনি সর্বদা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই নীতিগত অবস্থান থেকেই তিনি দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সুবাদে সংসদীয় গণতন্ত্রের ‘ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইল’ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বিশ্বাস করেন, এ ধরনের গণতান্ত্রিক চর্চা অনুসরণ করেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
অধিবেশনের শুরুতে ডেপুটি স্পিকারকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী দিলারা হাফিজ ও যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলীর মায়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয় এবং তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় সংসদে মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
গত ১২ মার্চ সাধারণ নির্বাচনের এক মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসে। দ্বিতীয় কার্যদিবস শেষে ১৫ মার্চ অধিবেশন ২৯ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। বর্তমান অধিবেশন আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে শুরু হওয়া এ অধিবেশনে বক্তব্যের শুরুতেই ডেপুটি স্পিকার মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। পাশাপাশি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি খালেদা জিয়াকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং প্রধানমন্ত্রী ও নেত্রকোনা-১ আসনের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে কায়সার কামাল বলেন, ‘এই আন্দোলন ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে দেশে গণতন্ত্রের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।’
তিনি শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মীর মুগ্ধসহ সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং আন্দোলনে আহত হয়ে যারা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রা:-এর ঐতিহাসিক বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘সঠিক হলে সহযোগিতা এবং ভুল হলে সংশোধনের মধ্য দিয়েই একটি কার্যকর সংসদ পরিচালিত হয়।’
তার মতে, সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।
সাধারণ মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে সংসদে আসার সুযোগ পাওয়াকে নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে একটি কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ গড়ে তুলতেই তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।
পাশাপাশি তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই সংসদে যারা এসেছেন, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে নিপীড়নের শিকার— ‘আমরা সবাই এখানে মজলুম হিসেবে সমবেত হয়েছি।’


