কৃষিতে আমরা ভর্তুকির কথা শুনি। কিন্তু প্রাণী ও মৎস্যে আমরা ভর্তুকি পাই না। এ খাতেও ভর্তুকি দরকার বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, মানুষ খাদ্য খায় বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু সেই খাদ্য কেন রোগের উৎস হচ্ছে। খাদ্য যেন রোগের উৎস না হয়। দেশের সামগ্রিক পুষ্টিচিত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা একটি ‘বিপজ্জনক প্রবণতা’। ধনী মানুষের আয় দিয়ে গরীব মানুষকে বিচার করবেন না।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দ্বিতীয় দিনের বিষয় ছিলো ‘জাতীয় প্রাণী সম্পদ সপ্তাহ: পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণি ও মৎস্য খাত’।
বিএজেএফ সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন বিএজেএফ সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।
ফরিদা আখতার জানান, ওপরের কয়েক শতাংশ মানুষের ভোগক্ষমতার গড় তুলে ধরা হলে বাস্তবে গরিব মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিঘাটতি আড়াল হয়ে যায়। ফলে নীতিনির্ধারণে ভুল ধারণা তৈরি হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক পুষ্টি–চাহিদা অজানাই থেকে যায়।
তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ শুধু উৎপাদনশীলতার জন্য নয়, গ্রামীণ খাদ্যচাহিদা, সংরক্ষণ সুবিধা, নারী কর্মসংস্থান ও কৃষির ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে শিল্প হিসেবে দেখা হলেও উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এখনো গ্রামীণ সাধারণ মানুষের হাতেই হচ্ছে। শিল্পায়ন প্রয়োজন, তবে দেশীয় প্রজাতির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে সংকর জাত তৈরির সময় যেন দেশীয় জাতের মৌল বৈশিষ্ট্য হারিয়ে না যায় সেদিকেও তিনি কঠোর সতর্কতা দেন।
পুষ্টিহীনতা প্রসঙ্গে ফরিদা আখতার বলেন, ‘জিরো হাঙ্গার’ মানে শুধু পেটভরে খাওয়া নয়, পুষ্টিমান নিশ্চিত করাও জরুরি। আমরা বছরে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার সংখ্যা ১৩৭টি বলি। কিন্তু এই গড় হিসাব ধনী–গরিবের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাসের বৈষম্যকে আড়াল করে দেয়। ফলে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত ভোগ্যচিত্র অদৃশ্য থেকে যায়।
তিনি বলেন, উৎপাদনকারী জেলার মানুষও অনেক সময় নিজ এলাকার দেশীয় মাছ খেতে পারেন না।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে দেশীয় মাছের স্বাদ অত্যন্ত ভালো হলেও অনেক সুনামগঞ্জবাসী এখন একোয়াকালচারের পাঙ্গাস খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব বাস্তব তথ্য সাংবাদিকদের তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
একইসাথে একোয়াকালচারের ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করে উপদেষ্টা বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ফিড ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এসব বিষয়ে এখনই নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
গোশত খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু গরুর গোশতই গোশতের একমাত্র উৎস নয়। মহিষ, ভেড়া, হাঁস-মুরগি ও কোয়েলসহ সব ধরনের গোশত ও ডিমের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রেড মিটের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও মাথায় রাখতে হবে।
খাদ্যে ফোর্টিফিকেশনকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক উৎসে উৎপাদিত খাবারের পুষ্টিগুণ বেশি।
কীটনাশকের ব্যবহার কমানো না গেলে খাদ্যই ভবিষ্যতে রোগের উৎসে পরিণত হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশীয় জাতের মাছ, গোশত ও প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ, যেগুলো রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। পৃথিবীর অনেক দেশের যেসব প্রাণিসম্পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আমাদের দেশে টিকে আছে।
সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা ও সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৎস্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প পরিচালক মো: জিয়া হায়দার চৌধুরী।
তিনি বলেন, মজুদ জরিপ, জেলেদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেইজ, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার ফলে বাংলাদেশ সুনীল অর্থনীতির বাণিজ্যিক ও টেকসই বিকাশের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মেরিন স্পেশিয়াল প্ল্যানিং, টেকসই আহরণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সমুদ্রের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন—এই চার খাতে বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে।
মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো: আবদুর রউফ বলেন, নদীর মাছ কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা চাষের ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনার কৌশল বাস্তবায়ন করছি। নিরাপদ মাছ উৎপাদন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: সাজেদুল করিম সরকার বলেন, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) এখন পর্যন্ত ৯৭টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। দুধ, ডিম ও গোশত উৎপাদনে জেনেটিক উন্নয়ন, ফডার প্রযুক্তি ও আধুনিক গবেষণার ফলে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।
ফিশ ফিড রফতানিতে নতুন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদিত ফিশ ফিড এখন আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি হচ্ছে, যা দেশের রফতানি খাতে নতুন দিগন্ত।



