প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রথম ছয় মাস অর্থাৎ ১৮০ দিনেই নেট মিটারিং সংযোগের মাধ্যমে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ নতুনভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও বিদ্যুৎ খাতের টেকসই উন্নয়নে সরকারের নেয়া বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অগ্রগতি সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মপরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নেট মিটারিং, এনার্জি স্টোরেজ, জাতীয় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি দক্ষতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
অপরদিকে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মপরিকল্পনায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ ট্যারিফ ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের নেয়া বেশিভাগ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মপরিকল্পনা শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। আর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অগ্রগতি হয়েছে ৯০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। দুই বিভাগ মিলিয়ে সরকারের সামগ্রিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ২৮ শতাংশে।
বিদ্যুৎ বিভাগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্রেডার উদ্যোগে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি রোডম্যাপ ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চেন্ট পলিসির আওতায় চারটি মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের মধ্যে ১০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া আরো একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, বায়োমাস ও বায়োগ্যাস, ক্লিন কুকিং, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ব্যবসায়িক মডেল প্রণয়ন করা হয়েছে। একইসাথে সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অফশোর উইন্ড পাওয়ার প্রকল্প উন্নয়ন গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে।
অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ঈশ্বরদী ও ভুলতা গ্রিড উপকেন্দ্রে যথাক্রমে ১২০ মেগাওয়াট ও ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভোলায় বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর বাইরে জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। পাশাপাশি ৩০টি ডেজিগনেটেড কনজুমারের স্থাপনায় জ্বালানি নিরীক্ষা করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিকল্পনা অনুযায়ী সাতটি গ্যাসকূপ খনন ও চারটি কূপের ওয়ার্কওভার কার্যক্রমের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি কূপের (সিলেট-১০ ও ১১, শ্রীকাইল-৫, রশিদপুর-১১, তিতাস-২৮ এবং সুন্দলপুর-৪) খনন সম্পন্ন হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক মোট ২১ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। অন্যদিকে, ওয়ার্কওভার সম্পন্ন শেষে চারটি কূপ থেকে দৈনিক আরো ১০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। ফলে নতুন করে মোট ৩২ দশমিক ০২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদন বলছে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে সারা দেশে ৫০টি কূপ খননের বৃহৎ কর্মসূচির আওতায় ২৮টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ২ হাজার হর্স পাওয়ারের একটি রিগ কেনার দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। একইসাথে ১ হাজার ৫০০ হর্স পাওয়ার রিগ ক্রয়ের ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসির-২০২৬ আওতায় বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অন্যদিকে, স্থলভাগে অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসির -২০২৬ খসড়া অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ২ডি সাইসমিক সার্ভের ৫০০ লাইন কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। তবে বর্ষাকালের কারণে ৩ডি সাইসমিক সার্ভের ১০০ বর্গকিলোমিটার কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ
মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশীয় জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বাস্তবায়ন মডেল নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৮ জুলাই জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে পিপিপি পদ্ধতিতে ট্রানজ্যাকশন এডভাইজার নিয়োগের জন্য ইওআই আহ্বান করা হয়েছে। ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণের লক্ষ্যে মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইআরএল প্রকল্পের কনসালট্যান্ট নিয়োগের জন্যও ইওআই আহ্বান করা হয়েছে।
কমেছে সিস্টেম লস
প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি খাতে এ বছরের ফেব্রুয়ারি-জুন এই পাঁচ মাসে সিস্টেম লস ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমিয়ে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। যা জানুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ০৩ শতাংশ।
অগ্রগতি প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩ অনুযায়ী কমিশনের গণশুনানির মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের ট্যারিফ নির্ধারণের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে। শিল্প খাতে গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় গ্যাস বরাদ্দ সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্যে নেয়া কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
সূত্র : বাসস



