সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদ ভবনে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর দেশে আবারো প্রত্যক্ষ ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের সদস্যরাই সরাসরি ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
বাংলাদেশে গত তিন দশক ধরে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীরাই এককভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। তবে এবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আলাদা প্রার্থী ঘোষণা করায় সেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি ভেঙে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর আগে ১৯৯১ সালে তৎকালীন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মধ্যে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হবেন- তা নির্ধারণে আজ ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রের এই শীর্ষ পদে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রেসিডেন্ট হওয়া নিশ্চিত হলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব:) অলি আহমেদ প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এ কারণে দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠেয় দেশের সর্বোচ্চ ও মর্যাদাশীল এই পদের জন্য নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি একপ্রকার চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল বুধবার নির্বাচন কমিশন ভবনে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষেই ভোট গণনা করে তাৎক্ষণিক ফল ঘোষণা করা হবে।
তিনি জানান, দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে। ভোটের পরে আমরা সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে গণনা শুরু করব। গণনার পরে নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে আমি যে ফল ঘোষণা করব, সেটাই আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত।
তার কথায়, ‘ভোটের পরে আমরা ওখানে ইন্সট্যান্টলি (তাৎক্ষণিক) গোনা শুরু করব। গোনার পরে রেজাল্ট যেটা আমি অ্যানাউন্স করব অ্যাজ নির্বাচনী কর্তা, দ্যাট ইজ ফাইনাল অ্যাজ পার ল’।’
তিনি জানান, ভোট গণনা শেষে সেখানেই (সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে) ফল ঘোষণা করা হবে। এরপর নির্বাচন ভবনে ফিরে ওই দিনই গেজেট প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে একটি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে দু’টি মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম।
সিইসি জানান, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। এ সময় প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর যাচাইয়ে জাতীয় সংসদ সচিবালয় নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করে।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার সময় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা যে রেজিস্টারে স্বাক্ষর করেছিলেন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় সেই রেজিস্টার নিয়ে আসে। এর সাথে মিলিয়ে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর যাচাই করা হয়।
সিইসি বলেন, ‘আমরা তিনটা মনোনয়নই বৈধ পেয়েছি। ১১ দলীয় ঐক্যের দু’টিই বৈধ এবং সরকারি দল বর্তমান বিএনপির মনোনয়নটাও বৈধ।’
তবে একই প্রার্থীর পক্ষে দু’টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ায় একটি মনোনয়নপত্রকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট হবে।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের বিষয়ে সিইসি বলেন, নির্ধারিত সময়ে কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।
ব্যালট পেপার ও ভোটদান পদ্ধতি
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ঠিক তত সংখ্যক ব্যালট পেপারই প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল এড়াতে কিছু অতিরিক্ত ব্যালট পেপারও সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। ভোটগ্রহণের দিন ব্যালট পেপারের রঙ হবে সাদার ওপর কালো প্রিন্ট। তিনি বলেন, ব্যালট পেপার ডাকযোগে বা অন্য কোনো মাধ্যমে আগে পাঠানোর সুযোগ থাকছে না। নির্বাচন সহায়ক কর্মকর্তা ও নির্দিষ্ট স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি সংসদ অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন। এই কার্যক্রমে সহায়তার জন্য প্রায় ২০ জন কর্মকর্তার একটি টিম ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
ফলাফল প্রকাশ ও আনুষ্ঠানিকতা
তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এরপর বিজয়ী প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে প্রকাশের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তার মতে, প্রাথমিক ফলাফল লিখিত আকারে প্রস্তুত থাকায় গেজেট প্রকাশে অতিরিক্ত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে না।



