পিইবি ও বিএইচআরএফের সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা

তামাকের ক্ষতি ব্যাপকভাবে কমাতে পারে আধুনিক বিকল্প

বাংলাদেশ এখনো একটি সুনির্দিষ্ট তামাকের ক্ষতি হ্রাস কৌশল নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি। তাই তামাকের নিরাপদ বিকল্পের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ধূমপান এখনো ব্যাপক এবং এটি জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

তামাকজনিত ক্ষতি ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারে ধূমপানের আধুনিক নিরাপদ বিকল্প। ভেপিং ডিভাইস, নিকোটিন পাউচ ও স্নাসের মতো আধুনিক পণ্যগুলো বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ধূমপায়ীকে ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করেছে।

যেসব দেশ তামাকের ক্ষতি হ্রাস কৌশল গ্রহণ করেছে সেখানে ধূমপায়ীর হার দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। আর ভারত, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়াসহ যেসব দেশ এই আধুনিক নিরাপদ পণ্যগুলো নিষিদ্ধ করেছে, সেখানে কালোবাজারি ও অনিয়ন্ত্রিত পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে উন্নতি হয়নি অথবা খুব সামান্যই হয়েছে।

বাংলাদেশ এখনো একটি সুনির্দিষ্ট তামাকের ক্ষতি হ্রাস কৌশল নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি। তাই তামাকের নিরাপদ বিকল্পের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ধূমপান এখনো ব্যাপক এবং এটি জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে “পলিসি ফর প্রগ্রেস : টুয়ার্ডস হার্ম রিডাকশন ২.০” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) এবং বাংলাদেশ হার্ম রিডাকশন ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ) রাজধানীতে যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ডা: ডেলন হিউম্যান বলেন, নিউজিল্যান্ড বাস্তবভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক কৌশল গ্রহণ করে সফলভাবে ধূমপান কমিয়ে আনতে পেরেছে। দেশটিতে ভেপিংয়ের মতো বিকল্পকে স্বীকৃতি দিয়ে মানুষকে ধূমপান ছাড়ার বাস্তব পথ দেখানো হয়েছে। এর ফলে মাত্র কয়েক বছরে দেশটিতে ধূমপানের হার প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘টেল অব টু নেশন্স : বাংলাদেশ ভার্সেস নিউজিল্যান্ড’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ডা: ডেলন হিউম্যান। ওই প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ধূমপায়ীর হার ছিল ১৩.৩ শতাংশ, যা সম্প্রতি কমে হয়েছে ৬.৯ শতাংশ। অন্য দিকে, বাংলাদেশে এই হার ২৩ শতাংশ থেকে কমে ১৭ শতাংশ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এ পার্থক্যের বড় কারণ হলো- নিউজিল্যান্ডে তামাক নিয়ন্ত্রণ কৌশলে ক্ষতি হ্রাস নীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি। তামাকের ক্ষতি কমানো সম্পর্কিত পণ্যগুলো আগে নিউজিল্যান্ডে সহজলভ্য ছিল না। পরে দেশটির সরকারের নীতি পরিবর্তনের পর তা সহজলভ্য হয় এবং এর ফলে ধূমপান কমেছে।

বাংলাদেশ হার্ম রিডাকশন ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ও চেয়ারম্যান এবং টেল অব টু নেশন্সের অন্যতম লেখক ড. মো: শরিফুল ইসলাম দুলু বলেন, নিউজিল্যান্ডের এই সাফল্যের মূল কারণ হলো তাদের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও তামাকের ক্ষতি হ্রাস কৌশলের অন্তর্ভুক্তি।

অন্য দিকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এ ক্ষতি হ্রাস কৌশল নেয়নি। এর পরিবর্তে ই-সিগারেটে যে কঠিন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এর ফলে অবৈধ বা চোরাচালানের পথ প্রশস্ত হচ্ছে, যার ফলস্বরূপ সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং ভোক্তারা একটি বিকল্প থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

থোলোস ফাউন্ডেশনের কনজিউমার ইস্যুজের ডিরেক্টর টিমোথি অ্যান্ড্রুস বিকল্প তামাকজাত পণ্যগুলোর সঠিক নিয়ন্ত্রণ এবং এ সংক্রান্ত সঠিক নীতিমালা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশটিতে ভেপ পণ্য নিষিদ্ধ করার ফলে এর অবৈধ বাজার, অপরাধ প্রবণতার পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে ধূমপান বেড়েছে। নিউজিল্যান্ডের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় তরুণদের ধূমপানের হার এখন প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

তিনি বলেন, ব্রাজিলে ই-সিগারেট অবৈধ। এই নিষিদ্ধকরণে সমস্যা আরো বেড়েছে। সেখানে ২৯ লাখ ই-সিগারেট ব্যবহারকারী আছে। তারা চাহিদার পুরোটাই কিনছে কালোবাজার থেকে। অনিরাপদ ও বেশি ক্ষতিকর মানহীন পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরো বেড়েছে। সেখানে নিরাপদ বিকল্পের অভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ধূমপায়ীর হার ২০২০ সালের ৯ দশমিক ৩ শতাংশে বেড়ে ২০২৪ সালে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

সুইডেনের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, গত তিন দশকে দেশটির বহু মানুষ ধূমপান ছেড়ে স্নাস নামক ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছেন। সিগারেটের তুলনায় এটি কম ক্ষতিকর। দেশটি এই ধরনের পণ্যের ওপর করের হারও কমিয়েছে। ফলে সুইডেন ধূমপানজনিত মৃত্যু ও রোগে আক্রান্ত মানুষের হার এখন অনেক কমে এসেছে।

বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেন্ডস্টা) সভাপতি সুমন জামান বলেন, নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট সিস্টেম হল ধূমপান ছাড়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায়ের একটি। গবেষণায় দেখা গেছে, ভেপিং বা হিটেড টোব্যাকো, নিকোটিন পাউচ, নিকোটিন গাম সিগারেটের চেয়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কম ক্ষতিকর। ধূমপানের ক্ষতি হ্রাসে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন দেশে এগুলোর সুফল পাওয়া গেছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের ইকোনমিস্ট অ্যান্ড সিনিয়র ম্যানেজার হাসনাত আলম বলেন, তামাকের ক্ষতিহ্রাস কৌশলের বিষয়টি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা স্বীকৃত। এর মাধ্যমে সিগারেটের নিরাপদ বিকল্পের কথা বলা হয়। প্রথমেই আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, এই পণ্যগুলো বিশ্বজুড়ে আছে এবং এগুলো প্রচলিত তামাক জাতীয় পণ্য থেকে কম ক্ষতিকর। এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বা অত্যধিক শুল্ক-কর নীতি ভুল বার্তা দিতে পারে। সেটি কালোবাজারিকে আরো উৎসাহিত করতে পারে। বিধিনিষেধগুলো অবশ্যই ভবিষ্যৎমুখী এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক হওয়া উচিত। যদি কোনো পণ্য প্রচলিত তামাক পণ্য থেকে কম ক্ষতিকর হয় এবং তামাকের ব্যবহার কমাতে সাহায্য করতে পারে তাহলে সে পণ্যটি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।