শুনে চমকে উঠলে? বলে কী! মানুষের তো ইন্দ্রিয় পাঁচটি। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা আর ত্বক—এই পঞ্চইন্দ্রিয়েই মানুষ। এর বাইরে কারো কারো বাড়তি আরেকটি ইন্দ্রিয় আছে—এমন দাবি লোকমুখে বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এবার বিজ্ঞানও যেন সেই কথার সাথেই তাল মিলিয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন এক অনুভূতির সন্ধান মিলেছে, যা পাঁচ ইন্দ্রিয়ের বাইরের হলেও আমাদের সুস্থ জীবন ও মানসিক ভারসাম্যের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহও বাড়ছে।
সায়েন্স অ্যালার্ট জানিয়েছে, এই অজানা ষষ্ঠ অনুভূতির নাম ইন্টারোসেপশন, বাংলায় বলা যেতে পারে অন্তঃঅনুভূতি। বিজ্ঞান সাংবাদিক ফিওনা ম্যাকডোনাল্ড তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, এটি হলো মানুষের নিজের শরীরের ভেতরে চলতে থাকা সংকেত টের পাওয়ার এবং সেগুলো বোঝার ক্ষমতা। হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, ক্ষুধা, তৃষ্ণা কিংবা শরীরের তাপমাত্রা—যেসব পরিবর্তন চোখে দেখা যায় না, সেগুলোর খবর মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয় এই অন্তঃঅনুভূতি।
লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জেনিফার মারফি এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফ্রেয়া প্রেন্টিস বলছেন, আমরা সচরাচর এ নিয়ে ভাবিই না। অথচ শরীরের প্রতিটি ব্যবস্থা ঠিকভাবে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করতে এই অনুভূতি সারাক্ষণ কাজ করে। তৃষ্ণা পেলে পানি খেতে, অতিরিক্ত গরম লাগলে পোশাক খুলে ফেলতে বা বিশ্রামের প্রয়োজন হলে শরীরকে সতর্ক করে দেয় এ অনুভূতি।
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। গবেষকেরা এখন দেখছেন, অন্তঃঅনুভূতি শুধু শরীরের জৈবিক চাহিদা মেটায় না। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সাথেও এর গভীর সম্পর্ক। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত সমস্যা (পিটিএসডি) এবং খাদ্যাভ্যাসজনিত বিভিন্ন মানসিক রোগের পেছনেও এর ভূমিকা থাকতেই পারে।
গবেষকদের ধারণা, শরীরের পেশির টান, শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদস্পন্দনের মতো সংকেত থেকেই আমাদের মস্তিষ্ক বুঝে নেয় কোনো পরিস্থিতি নিরাপদ নাকি অনিরাপদ। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটলে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেমন, উদ্বেগে ভোগা একজন মানুষ সামাজিক পরিবেশে নিজের দ্রুত হৃদস্পন্দন নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়েন। আর সেই সচেতনতাই তার অস্বস্তিকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
মারফি ও প্রেন্টিস ৯৩টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, নারী ও পুরুষের অন্তঃঅনুভূতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে হৃদস্পন্দন সঠিকভাবে অনুভব করার ক্ষেত্রে নারীদের নির্ভুলতা তুলনামূলক কম। তাদের ধারণা, বয়ঃসন্ধির পর নারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার বেশি হওয়ার পেছনে এটি আংশিক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এ বছর ইবায়োমেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের অন্তঃঅনুভূতি শক্তিশালী, ক্ষুধা পেলেও তাদের মেজাজের ওঠানামা তুলনামূলক কম হয়। জার্মানির তুবিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী নিলস ক্রোমার বলছেন, তারা ক্ষুধা অনুভব করেন না—এমন নয়; বরং শরীরের সংকেত ভালোভাবে বুঝতে পারায় নিজেদের আবেগ স্থির রাখতে পারেন।
সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ এসেছে ইউসিএলএর গবেষণায়। অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা হলো এক ধরনের গুরুতর খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক রোগ। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাবার খান বা খাওয়া এড়িয়ে চলেন। ফলে শরীরের ওজন বিপজ্জনকভাবে কমে যায়, এমনকি জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসায় আক্রান্ত রোগীদের গিলে খাওয়া যায় এমন কম্পনশীল ক্যাপসুল দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তারা শরীরের ক্ষুধার সংকেত ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। এমনকি ওজন স্বাভাবিক হওয়ার পরও সেই সমস্যা থেকে যায়। গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক স্নায়ুবিজ্ঞানী সাহিব খালসার ভাষায়, এসব রোগী শরীরের সংকেত ইচ্ছা করে উপেক্ষা করেন না; বরং তাদের স্নায়ুতন্ত্র অন্ত্র থেকে আসা সংকেত ভিন্নভাবে গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করে।
অবশ্য এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি সাময়িকীতে এমআইটির জ্ঞানবিজ্ঞানী ফেলিক্স শোলারের নেতৃত্বে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, ‘ইন্টারোসেপশন’ নামে আলাদা কোনো একক অনুভূতি নেই। বরং শরীরের নানা জটিল প্রক্রিয়াকে একটি শব্দে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অন্যদিকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যারি স্মিথের দাবি, মানুষের ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা ৩৩টিও হতে পারে।
তাহলে মানুষের ইন্দ্রিয় কি পাঁচটি, ছয়টি, নাকি আরও অনেক বেশি? বিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। তবে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে—যে ‘অন্তঃঅনুভূতি’কে এতদিন আমরা চিনতেই পারিনি, সেটিই হয়তো নীরবে আমাদের শরীর আর মনকে ভারসাম্যে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রহরীদের একটি। শুনে চমকে উঠলেও, মানুষের ‘ষষ্ঠ অনুভূতি’ নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান এখন আর কল্পকাহিনি নয়; এ এক বাস্তব গবেষণার বিষয়।



