বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগ রাজশাহীতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন সেবা না পেয়ে বেশ কিছু শিশু মারা গেছে বলে সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
চলতি মাসেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ভেন্টিলেশনসহ আইসিইউ সুবিধার অভাবে ৩৩টি শিশুর মৃত্যুর খবর দেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হবার পর এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। যদিও এদের ১০ থেকে ১২টি শিশু হামে আক্রান্ত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া, এ মাসে রাজশাহীতে এ রোগে আক্রান্ত ৮০টি শিশুকে চিকিৎসকরা আইসিইউতে নেয়ার সুপারিশ করলেও সবাইকে সেই সুবিধা দেয়া সম্ভব হয়নি বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এরই মধ্যে ওই হাসপাতালে ভেন্টিলেশন মেশিন দেয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
যদিও হামের কারণেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশুরা মারা গেছে কি-না, সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগের পরিচালক আবু হোসেইন মো: মইনুল আহসান।
তবে, বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউর ব্যবস্থা নেই, বরং খুবই কম জানিয়ে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক, প্রয়োজনীয় আইসিইউ আমাদের নেই। বাস্তবতা এটাই।’
দেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর সংখ্যা কত?
আইসিইউর পূর্ণরূপ ‘ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট’। কোনো কোনো হাসপাতালে এটিকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটও বলা হয়। রোগীর যখন একাধিক অঙ্গের জন্য সাপোর্ট প্রয়োজন হয়, সেই অবস্থার জন্য আইসিইউ।
আর খুব সঙ্কটময় অবস্থায় শ্বাসযন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখার প্রক্রিয়া হলো ভেন্টিলেশন। সাধারণ মানুষ যাকে বলে লাইফ সাপোর্ট।
বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী পরিমাণ আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর মেশিন ও এ সংক্রান্ত জরুরি সেবা রয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার।
সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান টেকনিক্যাল ম্যানেজার জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে মাত্র এক হাজার ৬২০টি আইসিইউ বেড রয়েছে।
যদিও, বেসরকারি হাসপাতালে এ সংখ্যা ঠিক কত সে তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
একইসাথে হাসপাতালগুলোতে কী পরিমাণ ভেন্টিলেটর মেশিন আছে তাও জানা যায়নি।
তবে, চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা জার্নাল বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল কেয়ার জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সেবা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ : আ প্রি অ্যান্ড পোস্ট কোভিড-১৯ প্যানডেমিক সার্ভে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা দুই হাজার ৮৫৬টি।
তবে, কোভিড মহামারির পরে আইসিইউ বেডের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে এখন প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা।
২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণার কথা উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র শূন্য দশমিক সাতটি ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা আইসিইউ বেড ছিল।
এ সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
তবে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা মো: আহসান দাবি করেন, ‘সত্যি কথা বলতে, এ মুহূর্তেও যদি বিদ্যমান আইসিইউর সংখ্যা দ্বিগুণ করি- তাও আমাদের প্রয়োজন মিটবে না।’
পৃথিবীর কোনো দেশেই পর্যাপ্ত আইসিইউ থাকে না বলে দাবি করে এ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এটা কিন্তু গ্লোবাল ইস্যু। পৃথিবীর কোনো দেশেই পর্যাপ্ত আইসিইউ থাকে না। কোভিডের সময় ইউরোপে যারা মারা গেছেন, তারা আইসিইউর অভাবেই মারা গেছেন।’
তিনি বলেন, ‘ইভেন আমেরিকায় যারা মারা গেল তাদের বড় অংশও আইসিইউর অভাবে মারা গেছেন।’
পেডিয়াট্রিক আইসিইউ কী?
বাংলাদেশে এডাল্ট অর্থাৎ প্রাপ্ত বয়স্ক ও নিওনেটাল বা সদ্যজাত শিশুর জন্য আইসিইউ থাকলেও পেডিয়াট্রিক মানে অল্পবয়সী শিশুদের জন্য আইসিইউ স্বল্পতা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।
ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান আশরাফ জুয়েল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে এটা খুব রুড রিয়েলিটি যে, যেভাবে অ্যাডাল্ট আইসিইউ ও নিওনেটাল আইসিইউ হয়েছে সেভাবে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ হয়নি।’
জন্মের পর থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত নিওনেটাল বা সদ্যোজাত শিশুর জন্য ‘নিওনেটাল আইসিইউ বেড প্রয়োজন হয়’ বলে জানান তিনি। এটি একটি ছোট্ট কটের মতো বেডের আকারের হয় এবং এতে জায়গা খুব কম লাগে বলে সংখ্যায় বেশি রাখা যায় বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশে মোট আইসিইউর প্রায় ২৫ শতাংশের মতো নিওনেটাল আইসিইউ বেড রয়েছে বলে জানান আশরাফ জুয়েল।
যেসব শিশুর বয়স ১৩ বা ১৪ বছর এবং ওজন ৫০ কেজির নিচে তাদের সাধারণত পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে চিকিৎসা করা হয়। অফিসিয়ালি ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুদের এই বেডে চিকিৎসা করা হয়।
ডা: জুয়েল বলেছেন, ‘পেডিয়াট্রিক আইসিইউগুলোতে অ্যাডাল্ট আইসিইউর বেডের মতোই সব ধরনের ফ্যাসিলিটিজ থাকা উচিত। অক্সিজেন, মনিটর, ভেন্টিলেটরসহ অন্য যেসব ফ্যাসিলিটিজ থাকে তা থাকতে হবে।’
তবে, মোট আইসিইউ বেডের মাত্র তিন শতাংশের মতো এই পেডিয়াট্রিক আইসিইউ রয়েছে বলে জানান তিনি।
কোভিডের সময় থেকেই এর প্রয়োজনীয় উপলব্ধি হলেও এখনো তা হয়নি, যা দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় পেডিয়াট্রিক আইসিইউ না থাকায় সব জেলা থেকে হামের রোগীদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই সেবার জন্য যেতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে কোভিড ও ডেঙ্গুতেও পেডিয়াট্রিক আইসিইউ স্বল্পতার কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে এই সঙ্কট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে ‘কোনো মতে কাজ চালিয়ে নেয়ার’ কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে আইসিইউ কনসালটেন্ট ডা: জুয়েল বলেন, ‘একটা সাসটেইনেবল পলিসি ও ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্টে যেতে হবে।’
হামের রোগীকে কি আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন দিতে হয়?
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মিজলস ভাইরাসের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। একজন আক্রান্ত শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার চারপাশের ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে বলে জানান চিকিৎসকরা। এটি মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে, অর্থাৎ রেসপিরেটরি ড্রপলেট দিয়ে ছড়ায়।
বিআরবি হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ও নিওনেটোলোজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট আয়েশা পারভীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘হাম খুবই ছোঁয়াচে একটি রোগ। তীব্র তাপমাত্রার জ্বর শুরুর তিন থেকে চারদিন পর শরীরে লাল লাল র্যাশ হয়।’
কখন হামে আক্রান্ত রোগীর আইসিইউ, ভেন্টিলেশন দেয়া প্রয়োজন হয়- এমন প্রশ্নে ডা: পারভীন বলেন, হামের সাথে অন্যান্য জটিলতা তৈরি হলেই আইসিইউ সেবা প্রয়োজন হয়।
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যেমন সাধারণত এক বছরের নিচে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, ক্যান্সার পেশেন্ট বা যারা বিভিন্ন থেরাপি নেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হামের পরে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি বলেছেন, হাম হলে সবসময় আইসিইউ লাগে না।
তবে, কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে এর প্রয়োজন হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি হামের সাথে বাচ্চার কমপ্লিকেটেড নিউমোনিয়া হয়ে যায়, যখন বাচ্চার প্রচণ্ড পরিমাণ শ্বাসকষ্ট হয় এবং অক্সিজেন সাপোর্ট লাগে, অথবা ব্রেনের কোনো প্রদাহজনিত রোগে বাচ্চা আক্রান্ত হয়- তখন আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে।’
ডা: পারভীন বলেন, ‘যদি কোনো শিশু তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে অক্সিজেন নিতে না পারে তখন তাকে ভেন্টিলেটর মেশিনের মাধ্যমে অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হয়। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে ফুসফুস ঠিকমতো কাজ না করলে তখন ভেন্টিলেশন দেয়া হয়।’
হামে শিশুদের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করবে স্বাস্থ্য অধিদফতর
রাজশাহীতে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যুর খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ওই বিভাগীয় হাসপাতালে আইসিইউর জন্য চারটি ভেন্টিলেটর মেশিন দেয়ার হচ্ছে।
তবে, মারা যাওয়া শিশুদের মৃত্যু হামেই হয়েছে কি-না তা যাচাই করে দেখার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগের পরিচালক আবু হোসেইন মো: মইনুল আহসান।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এটা ভেরিফাই করতে হবে। আমরা বিষয়টা দেখছি। কিন্তু হামে মৃত্যু বলতে হলে তা নিশ্চিত হয়ে বলতে হবে। অ্যাটলিস্ট একটা ডায়াগনস্টিক এভিডেন্স থাকতে হবে।’
‘হামে মৃত্যু আর হামজনিত রোগে মৃত্যু দু’টি ভিন্ন জিনিস’ বলে উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘হামে মৃত্যু বলতে হলে আরটিপিসিআর টেস্ট করে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করে বলতে হবে। সেজন্য এই সংখ্যাটা আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না। হয়তো হামের উপসর্গ ছিল সেই বাচ্চা মারা গিয়েছে। কিন্তু অ্যাকচুয়ালি সে মিজেলসে না-কি মিজেলসজনিত রোগে মারা গিয়েছে, এইটা আমরা বলতে পারছি না।’
সূত্র: বিবিসি



