হাসপাতালে দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা দিয়ে দু’টি কেনা হয়েছিল। কিন্তু যেখানে সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোই প্রস্তুত ছিল না। ফলে একটি মেশিন ফরিদপুরে এবং অন্যটি খুলনায় অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
বক্তব্য রাখছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো: সাখাওয়াত হোসেন
বক্তব্য রাখছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো: সাখাওয়াত হোসেন |ইউএনবি

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। একই সাথে টেস্ট বাণিজ্য, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, টেন্ডার কারসাজি ও অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

বুধবার ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেন্ট রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।

মন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব রেখে বাইরে পাশের ক্লিনিক খুলবেন, সরকারি দায়িত্ব রেখে সেখানে সার্জারি করবেন, কমিশন খাবেন, রোগী এলে বলবেন পাশের ক্লিনিকে গিয়ে টেস্ট করতে- এসব বন্ধ করতে হবে। এগুলো আমরা মনিটর করব।

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে এমন অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, যা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, যা প্রতিযোগিতা সীমিত করারই কৌশল।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থ অপচয়ের উদাহরণ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা দিয়ে দু’টি কেনা হয়েছিল। কিন্তু যেখানে সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোই প্রস্তুত ছিল না। ফলে একটি মেশিন ফরিদপুরে এবং অন্যটি খুলনায় অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। একইভাবে প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল ছাড়াই দেশের বিভিন্ন স্থানে এক্স-রে ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনে ফেলে রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, একটি বিদেশী কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডায়ালাইসিস সেবার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। নভেম্বরে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। সরকার নিজস্ব উদ্যোগে ডায়ালাইসিস মেশিন কিনবে। এর ফলে আগামী ডিসেম্বর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি কম খরচে ডায়ালাইসিস সেবা দেয়া সম্ভব হবে। এছাড়া প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যা এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন ও এআই-সমৃদ্ধ ‘কিট বক্স’ দেয়া হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উচ্চতা, ওজন, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তের লিপিড প্রোফাইল, আরবিসি ও সিবিসি পরীক্ষা করবেন। পুরুষদের কাছে পুরুষ এবং নারীদের কাছে নারী স্বাস্থ্যকর্মী যাবেন।

মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাজে অডিটের নামে এক টাকাও ঘুষ দেয়া যাবে না। সৎ থাকলে কাউকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। অডিটে কেউ অনৈতিক টাকা চাইলে সরাসরি আমার কাছে আসবেন।

হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ভয় দেখিয়ে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন করানোর প্রবণতা বন্ধে কঠোর তদারকি শুরু হয়েছে। সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সারাদেশে বেসরকারি ক্লিনিকে আকস্মিক পরিদর্শন জোরদার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় লেবার রুম, লেবার চেয়ার ও নবজাতকের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া পরিচালিত অনেক ক্লিনিক ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং এ অভিযান আরো জোরদার করা হবে।

অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো: এনামুল হক।

গবেষণায় দেশের আটটি বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা এবং ৯৫ জন কর্মকর্তার জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত চর্চা মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপক, জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ ও রোগীদের সাথে ৩২টি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে এ হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের অর্থ অব্যয়িত থাকলেও মাত্র ১১ শতাংশ উত্তরদাতা আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গবেষণায় বলা হয়, অব্যয়িত অর্থের প্রধান কারণ আর্থিক অনিয়মের চেয়ে বাজেট ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতা।

এছাড়া সাধারণ সরঞ্জাম খাতে বরাদ্দের মাত্র ২৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ভ্রমণ ও স্থানান্তর খাতে ব্যয়ের হার ছিল ৬৮ শতাংশ এবং পেশাগত সেবা ও সম্মানী খাতে ৫৯ শতাংশ।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের মহাপরিচালক দিল আফরোজাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র : ইউএনবি