ই-পাসপোর্ট সেবা নিয়ে ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশের জন্য পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়; বরং বৈধ বসবাস, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং কার্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, আবাসন নবায়ন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের অন্যতম প্রধান পরিচয়পত্র।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
ই-পাসপোর্ট
ই-পাসপোর্ট |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ই-পাসপোর্ট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশীদের জন্য ধাপে ধাপে এ সেবা চালু হলেও ফ্রান্সে বসবাসরত প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম শুরু হয়। এই উদ্যোগকে অধিকাংশ প্রবাসী স্বাগত জানালেও সেবা চালুর পর থেকেই আবেদন প্রক্রিয়া, অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব নিয়ে প্রবাসী সমাজে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশের জন্য পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়; বরং বৈধ বসবাস, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং কার্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, আবাসন নবায়ন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের অন্যতম প্রধান পরিচয়পত্র। ফলে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় ই-পাসপোর্ট চালুর মাধ্যমে দ্রুত ও আধুনিক সেবা পাওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে অনেক আবেদনকারী সেই প্রত্যাশার পুরোপুরি প্রতিফলন দেখতে পাননি।

দূতাবাসে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবেদনকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। দূতাবাসের সীমিত জনবল ও নির্দিষ্ট সংখ্যক বায়োমেট্রিক বুথের কারণে প্রতিদিন সীমিতসংখ্যক আবেদন গ্রহণ সম্ভব হওয়ায় অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক আবেদনকারী অভিযোগ করেন, অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য দিনের পর দিন ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ করেও কাঙ্ক্ষিত তারিখ পাওয়া যায় না। কেউ কেউ আবার কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস অপেক্ষা করার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন।

এছাড়া ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর থেকে প্যারিসে আসা প্রবাসীদের ভোগান্তি আরও বেশি। লিয়োঁ, মার্সেই, তুলুজ, বোর্দো, নিস কিংবা স্ট্রাসবুর্গ থেকে দূতাবাসে পৌঁছাতে অনেকের কয়েকশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর পরও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হওয়ায় তাদের সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক আবেদনকারী মনে করেন, সামান্য কোনো কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলেও নতুন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হওয়ায় সমস্যার মাত্রা আরো বেড়ে যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রবাসী ফেসবুক গ্রুপে কেউ দূতাবাসের সেবার প্রশংসা করছেন, আবার কেউ তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে যোগাযোগ ব‍্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টি। অনেক আবেদনকারী দাবি করেন, ফোন বা ই-মেইলে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় না এবং আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে সে সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য জানা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে থাকেন।

অন্যদিকে দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব কে এফ এম শারহাদ শাকিল নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ই-পাসপোর্ট একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি আবেদনকারীর ছবি, আঙুলের ছাপ, স্বাক্ষরসহ অন্যান্য তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়। এরপর পাসপোর্ট অধিদফতরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য যাচাই ও অনুমোদনের পরই পাসপোর্ট মুদ্রণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।’

তিনি বলেন, ‘আবেদনকারীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেলে সেবা প্রদানে কিছুটা বিলম্ব হওয়া অস্বাভাবিক নয়।’

তার ভাষ্য, ‘শুরুতে যে সমস্যাগুলো ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা হচ্ছে। একই সাথে সেবার মান উন্নয়নে নিয়মিত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’

প্রবাসী কমিউনিটির অনেক প্রতিনিধি মনে করেন, সমস্যার সমাধানে শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; সেবা ব্যবস্থাপনায় আরো সমন্বয় প্রয়োজন। তাদের মতে, নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট চালু, আবেদনকারীদের সাথে দ্রুত যোগাযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং দূরবর্তী শহরগুলোতে মোবাইল কনস্যুলার সেবা চালু করা গেলে অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিশেষ করে যেসব প্রবাসী কর্মব্যস্ততার কারণে বারবার প্যারিসে যেতে পারেন না, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি দীর্ঘদিনের।

তবে সব অভিযোগের মধ্যেও অনেক আবেদনকারী স্বীকার করছেন যে ই-পাসপোর্ট চালু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আধুনিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ এই পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য এবং পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকিও অনেক কম। ফলে প্রাথমিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে এই সেবা প্রবাসীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় সুবিধা বয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সরকারি সেবা চালুর ক্ষেত্রে শুরুতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কিন্তু নাগরিকের আস্থা অর্জনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত সমস্যার সমাধান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের ই-পাসপোর্ট সেবা নিয়ে যে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে, সেটিকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কারণ প্রবাসীদের প্রত্যাশা একটাই—দ্রুত, স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত এবং মানসম্মত কনস্যুলার সেবা। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেই ই-পাসপোর্ট প্রকল্প তার প্রকৃত সাফল্য অর্জন করবে।

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে পাসপোর্ট সংক্রান্ত সংবাদ ও কমেন্টসের প্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশ দূতাবাস ফ্রান্স কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় করেন। সেই অনুষ্ঠানে আলোচনার ভিত্তিতে দূতাবাস কয়েকটি বিশেষ কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম ঘোষণা করে।

ঘোষণায় বলা হয়, ফ্রান্স সরকারের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বৈধতার আবেদন (রেগুলারাইজেশন) করার জন্য যেসব প্রবাসী ফরাসি প্রিফেকচার অফিস থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছেন, তাদের পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে গতকাল শনিবার ২৫ জুলাই ২০২৬ সকাল থেকে শুরু হওয়া পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিশেষ সেবামূলক কার্যক্রম আগামী ৮ আগস্ট ও ২২ আগস্ট (শনিবার) দূতাবাসে বিশেষ কনস্যুলার সেবা প্রদান করা হবে। ওই দিনগুলোতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই সারাদিন পাসপোর্টসংক্রান্ত সেবা দেয়া হবে বলে দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া গত ১৬ জুলাই থেকে আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্টের নতুন স্লট উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রতিদিনের নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের অর্ধেক অনলাইন আবেদনকারীদের জন্য এবং বাকি অর্ধেক ১৫ মে-এর আগে ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদনকারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে বলেও জানানো হয়।

তবে দূতাবাসের ঘোষণার পর ছুটির দিনেও সেবা কার্যক্রম চালু থাকলেও আজ পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের তেমন কোনো ভিড় দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মোট ৮৬ জন আবেদনকারী পাসপোর্ট-সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করেছেন। এই বিশেষ সেবা প্রদান কার্যক্রমে দূতাবাসের অনুরোধের প্রেক্ষিতে কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রীয় কাজে এ ধরনের সহায়তা ইতিবাচক বলে অনেকে মন্তব্য করেন।

পাসপোর্ট-সংক্রান্ত ভোগান্তির বিষয়ে সিলেটের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘তিন মাস আগে আবেদন করেছি। গতকাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছি। যত দ্রুত সম্ভব অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হলে আমাদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।’

প্যারিস প্রবাসী ঢাকার খান খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রদানের ক্ষেত্রে আগের নিয়মে ফিরে যাওয়া উচিত। ওই পদ্ধতিতে দ্রুত সময়ে এবং প্রয়োজনে বিশেষ বিবেচনায়ও অনেকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কিংবা অসাধু উপায় অবলম্বনের কোনো সুযোগ থাকত না।’

চট্টগ্রামের আরাফাত রহমান বলেন, ‘কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে দূতাবাসকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার সাথে বাস্তবতার মিল নেই।’

তিনি জানান, নতুন নিয়মে অনলাইনের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ইতোমধ্যে পাসপোর্টও সংগ্রহ করেছেন।

এ বিষয়ে বিএনপি নেতা রেজাউল করিম রেজা বলেন, ‘নতুন ব্যবস্থায় যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তবে আগের নিয়মে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।’

একই সাথে তিনি বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দূতাবাস ও সরকারের বিরুদ্ধে চলা অযাচিত নেতিবাচক প্রচারণা ও মন্তব্যের সমালোচনা করেন।

বাংলাদেশ নাগরিক পরিষদের সভাপতি আবুল খায়ের লস্কর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দূতাবাস নাগরিক সেবায় আগের তুলনায় অনেক গতিশীল বলে আমাদের কাছে প্রতিয়মান।’

তিনি নাগরিক সেবার প্রশ্নে আরও যত্নশীল হওয়ার জন‍্য দূতাবাসের প্রতি আহ্বান জানান।

এনসিপি নেতা অ্যাডভোকেট মনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘জুলাই মাসকে টার্গেট করে আওয়ামী ফ‍্যাসিবাদের দোসরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টার অংশ হিসেবে দূতাবাসের সেবা নিয়ে নেতিবাচক বয়ান তৈরি করছে।’

তিনি বলেন, ‘যারাই সামাজিক মাধ্যমে ই-পাসপোর্ট সেবার বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে, তারা ফ‍্যাসিবাদের সময়ে বাংলাদেশ দূতাবাস দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে কাছেও ভিড়তে দেয়নি।’

তিনি ওদের ঘৃন‍্য চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিতে দেশপ্রেমিকদের ঐক‍্য কামনা করেছেন।