সঙ্গীতের উৎসবে মুখর ছিল ফ্রান্স

রোববার বিকেল থেকেই ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। জ্যাজ, রক, পপ, শাস্ত্রীয়, লোকসঙ্গীত, র‌্যাপ ও ইলেকট্রনিক সঙ্গীতসহ নানা ধারার পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। গরম উপেক্ষা করে শিল্পী ও দর্শকরা সমান উৎসাহে অংশ নেন বিভিন্ন আয়োজনে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে ফ্রান্সে উৎসবের উচ্ছ্বাস
বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে ফ্রান্সে উৎসবের উচ্ছ্বাস |নয়া দিগন্ত

প্রচণ্ড দাবদাহ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েন—কোনো কিছুই ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত উৎসবের উচ্ছ্বাসকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

রোববার (২১ জুন) দেশজুড়ে উদযাপিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত ‘ফেত দে লা মিউজিক’ বা ‘সঙ্গীত উৎসব’। তীব্র গরমের মধ্যেও বিকেল থেকে গভীর রাত, এমনকি ভোর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শহর, জনপদ ও পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের ঢল নেমেছিল।

এ বছর জুন মাসের শুরু থেকেই ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। আবহাওয়ার এই বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও উৎসবপ্রেমীদের আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাট, পার্ক, স্কয়ার, রেস্তোরাঁ, বার ও কফিশপে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে উপভোগ করে এই সঙ্গীতময় উৎসব।

১৯৮২ সালে ফ্রান্সে শুরু হওয়া এই উৎসব বর্তমানে বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে পালিত হয়। প্রতি বছর ২১ জুন, বছরের দীর্ঘতম দিনের সন্ধ্যায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান সঙ্গীতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার এক অনন্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত। এদিন পেশাদার ও অপেশাদার শিল্পীরা উন্মুক্ত পরিবেশে বিনামূল্যে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

রোববার বিকেল থেকেই ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। জ্যাজ, রক, পপ, শাস্ত্রীয়, লোকসঙ্গীত, র‌্যাপ ও ইলেকট্রনিক সঙ্গীতসহ নানা ধারার পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। গরম উপেক্ষা করে শিল্পী ও দর্শকরা সমান উৎসাহে অংশ নেন বিভিন্ন আয়োজনে। অনেক স্থানে স্বেচ্ছাসেবীরা বিনামূল্যে পানি বিতরণ করেন এবং স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক নির্দেশনাও দেয়া হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকরাও এ উৎসবে যোগ দেন। স্পেন থেকে আসা পর্যটক মারিয়া গার্সিয়া বলেন, ‘আবহাওয়া অনেক গরম ছিল, কিন্তু মানুষের উৎসাহ দেখে সেটা ভুলে যেতে হয়েছে। পুরো শহর যেন সঙ্গীতের আনন্দে ভেসে যাচ্ছিল।’

কানাডার পর্যটক ডেভিড মার্টিন বলেন, ‘গরম অবশ্যই ছিল, তবে এমন একটি উৎসব মিস করার প্রশ্নই আসে না। মানুষের প্রাণবন্ত অংশ নেয়া আমাকে মুগ্ধ করেছে।’

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্য প্রবাসী রাকিব হোসেন বলেন, ‘তাপদাহের মধ্যেও এত মানুষকে একসাথে গান গাইতে, নাচতে এবং আনন্দ করতে দেখা সত্যিই অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’

জাপানি পর্যটক ইউকি তানাকা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম গরমের কারণে হয়তো মানুষের উপস্থিতি কম হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখলাম, উৎসবের আনন্দের কাছে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা হার মেনেছে।’

উৎসবস্থলগুলো ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিদেশী পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। কেউ বন্ধুদের সাথে, কেউ পরিবার নিয়ে, আবার কেউ একাই সঙ্গীতের টানে যোগ দিয়েছেন এই আয়োজনে। রাত বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ভিড়ও বাড়তে থাকে। নানা ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবটি যেন এক আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে নানা সঙ্কট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও এ ধরনের আয়োজন মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হলেও স্বস্তি ও আনন্দ দেয়। এবারের সঙ্গীত উৎসব প্রমাণ করেছে, তীব্র তাপদাহ কিংবা বৈশ্বিক উদ্বেগ—কোনো কিছুই মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনা ও আনন্দ উদযাপনের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

ভোর পর্যন্ত চলা এ উৎসবে সঙ্গীত, সম্প্রীতি ও মানবিক বন্ধনের এক অনন্য চিত্র ফুটে ওঠে। সুরের মূর্ছনায় এক দিনের জন্য যেন পুরো ফ্রান্স পরিণত হয়েছিল একটি বিশাল উন্মুক্ত মঞ্চে, যেখানে তাপদাহকেও হার মানিয়েছে মানুষের উৎসবমুখর অংশ নেয়া।

এবারের সঙ্গীত উৎসবে বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকে তিনটি ভিন্ন স্থানে বাংলা গানের আয়োজন করা হয়। ও-বার-ভিয়ে এলাকায় এসকে সাউন্ড আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জলের গান’-এর রাহুল আনন্দ গান পরিবেশন করেন।

এছাড়া লা কুরনেভ ও গার দ্য নর এলাকাতেও পৃথক দু’টি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।