ই-স্পোর্টে সৌদি আরবের বিশাল বিনিয়োগ

বিশ্বব্যাপী ই-স্পোর্টের জনপ্রিয়তা এবং এই খাতে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে অনুষ্ঠানটি রিয়াদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ই-স্পোর্টস বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ই-স্পোর্টস বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন |নয়া দিগন্ত

ই-স্পোর্ট বা প্রতিযোগিতামূলক ভিডিও গেমিংকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সৌদি আরব। দেশটির যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে রিয়াদ এই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে নতুন শিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে সৌদি আরবকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিনোদনকেন্দ্রিক দেশ হিসেবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে প্যারিসের গ্রঁ পালে অনুষ্ঠিত ই-স্পোর্ট বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান।

প্যারিসে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতাটি ছিল সৌদি আরবের বাইরে ই-স্পোর্ট বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজন। নিকটপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এবারের প্রতিযোগিতার স্থান সৌদি আরব থেকে ফ্রান্সে সরিয়ে নেয়া হয়। বিশ্বব্যাপী ই-স্পোর্টের জনপ্রিয়তা এবং এই খাতে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে অনুষ্ঠানটি রিয়াদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।

সৌদি আরবের বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশটির অর্থনীতিকে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে বের করে আনা। সেই লক্ষ্যেই প্রযুক্তি, পর্যটন, বিনোদন ও ক্রীড়ার পাশাপাশি গেমিং শিল্পকে গুরুত্ব দিচ্ছে সৌদি সরকার। ২০২২ সালে ই-স্পোর্ট ও গেমিং খাতের জন্য বিশেষ কৌশল গ্রহণ করে রিয়াদ। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে ২৫০টি গেমিং ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, প্রায় ৩৯ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সৌদি অর্থনীতিতে ১৩.৩ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশগুলোর একটি হলো ই-স্পোর্ট বিশ্বকাপ। ২০২৩ সালে চালু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের জনপ্রিয় ভিডিও গেমগুলোর শীর্ষ খেলোয়াড় ও দলগুলো অংশ নেয়। সাধারণত রিয়াদে প্রায় দুই মাস ধরে এই আয়োজন চলে এবং এর মাধ্যমে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক গেমিং জগতের অন্যতম বড় আয়োজনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্যারিসে এবারের সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজন এবং সেখানে সৌদি যুবরাজের উপস্থিতি এই খাতে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টিও সামনে এনেছে।

ই-স্পোর্টে সৌদি আরবের বিনিয়োগকে দেশটির ‘সফট পাওয়ার’ কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফুটবল ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন, পর্যটন এবং বিনোদন শিল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি ভিডিও গেমিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের সাথে সৌদি আরবের নতুন ধরনের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বিনোদনের সাথে দেশটির নাম যুক্ত করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরোনো ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছে রিয়াদ।

তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে, বড় বড় ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক আয়োজন এবং ই-স্পোর্টে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সৌদি সরকারের দৃষ্টিতে এসব উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের বাস্তব অংশ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরির মাধ্যম।

ই-স্পোর্টের মাধ্যমে সৌদি আরব শুধু প্রতিযোগিতার আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। গেম তৈরি, প্রযুক্তি, ডিজিটাল বিনোদন, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট পরিষেবাগুলোকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পখাত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে এই খাতের সাথে যুক্ত করা এবং বিদেশী বিনিয়োগ ও দক্ষতা আকর্ষণ করাও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফলে সৌদি আরবের কাছে ই-স্পোর্ট এখন শুধুই বিনোদন বা ক্রীড়া নয়। এটি অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের নতুন পরিচয় তুলে ধরার একটি কৌশলগত হাতিয়ার। তেলনির্ভর অর্থনীতির পরিচয়ের বাইরে প্রযুক্তি, গেমিং, বিনোদন ও তরুণ প্রজন্মের দেশ হিসেবে সৌদি আরবকে প্রতিষ্ঠিত করার ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনায় ই-স্পোর্ট তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।