সৌদিতে জেদ্দা বন্দর-রিয়াদ মেট্রো উন্নয়নে বিলিয়ন ইউরোর চুক্তি

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিজে প্রাসাদ জানিয়েছে, সৌদি আরবের সাথে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সিএমএ সিজিএম ও আলস্টমের চুক্তিগুলোর মোট মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরো। এসব চুক্তিকে সৌদি আরবের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশটিকে বৈশ্বিক লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ
সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ |নয়া দিগন্ত

সৌদি আরব ও ফ্রান্সের মধ্যে পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরোর দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) প্যারিসে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের ফ্রান্স সফরের সময় চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় জেদ্দা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং রিয়াদ মেট্রোর জন্য নতুন ট্রেন সরবরাহ করা হবে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিজে প্রাসাদ জানিয়েছে, সৌদি আরবের সাথে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সিএমএ সিজিএম ও আলস্টমের চুক্তিগুলোর মোট মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরো। এসব চুক্তিকে সৌদি আরবের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশটিকে বৈশ্বিক লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চুক্তির একটি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান সিএমএ সিজিএম এবং জেদ্দা বন্দরের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)-এর মধ্যে। এর আওতায় লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত জেদ্দা বন্দরে একটি নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটিতে প্রায় ৪৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৩৭২ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করা হবে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে জেদ্দা বন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন টার্মিনালে গভীর পানির নতুন জাহাজ নোঙরের স্থান বা জেটি নির্মাণ করা হবে। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কনটেইনারবাহী জাহাজগুলোও সেখানে সরাসরি নোঙর করতে পারবে।

পাশাপাশি বন্দরের কনটেইনার ওঠানামা ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বছরে প্রায় ২৬ লাখ টিইইউ বাড়বে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৬ লাখ ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের সমমানের কনটেইনার অতিরিক্তভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

সিএমএ সিজিএম জানিয়েছে, এই অংশীদারত্ব জেদ্দা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে সৌদি আরবের অবস্থান আরো শক্তিশালী করবে। প্রতিষ্ঠানটি সৌদি আরবকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে গড়ে তোলার প্রচেষ্টার সাথে প্রকল্পটিকে যুক্ত করেছে।

লোহিত সাগরের তীরে অবস্থানের কারণে জেদ্দা বন্দর ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফলে জেদ্দা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ সৌদি আরবের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

অন্যদিকে সৌদি রাজধানী রিয়াদের গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নেও বড় ধরনের চুক্তি হয়েছে। ফরাসি রেল ও পরিবহন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলস্টম এবং রয়্যাল কমিশন ফর রিয়াদ সিটির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, রিয়াদ মেট্রোর ৩ ও ৬ নম্বর লাইনের জন্য অতিরিক্ত মেট্রো ট্রেন সরবরাহ করবে আলস্টম। এ চুক্তির মূল্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ইউরো।

রিয়াদ মেট্রো সৌদি আরবের অন্যতম বড় নগর পরিবহন প্রকল্প। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মেট্রো ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে সৌদি সরকার। অতিরিক্ত ট্রেন যুক্ত হলে বিদ্যমান মেট্রো লাইনগুলোর যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে।

তবে আলস্টমের সাথে সৌদি আরবের সহযোগিতা শুধু ট্রেন সরবরাহে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই পক্ষ রিয়াদ মেট্রোর প্রস্তাবিত ৭ নম্বর লাইনের জন্য সৌদি আরবের অভ্যন্তরে মেট্রো ট্রেনের সংযোজন বা অ্যাসেম্বলি কারখানা স্থাপনের বিষয়েও একটি চুক্তি করেছে।

নতুন কারখানাটি রিয়াদ মেট্রোর ৭ নম্বর লাইনের জন্য ট্রেন সংযোজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আলস্টম ও রিয়াদ নগরীর রয়্যাল কমিশন জানিয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবে আলস্টমের বিনিয়োগ ও স্থানীয় শিল্প সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং রেল খাতে দক্ষ লোকবল তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর সাথেও এসব প্রকল্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন, শিল্প, পরিবহন, লজিস্টিকস ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি।

ফ্রান্সের সাথে সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো সেই কৌশলেরই আরেকটি উদাহরণ। জেদ্দা বন্দরের সম্প্রসারণ সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যকে এগিয়ে নেবে। একইসাথে রিয়াদ মেট্রোর সম্প্রসারণ রাজধানীর নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করার সুযোগ তৈরি করবে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্যারিস সফরের সময় স্বাক্ষরিত এসব চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও ফ্রান্সের মধ্যে পরিবহন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরো গভীর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরোর এই চুক্তি সৌদি আরবের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও পরিবহন রূপান্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।