৪০ বছরে মিউজে দ’অর্সে, থমাস জোলির ‘বুম ১৯৮৬’-তে নাচবে প্যারিস

মিউজে দ’অর্সের বর্তমান ভবনটির ইতিহাসও এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। ভবনটি মূলত ছিল একটি রেলস্টেশন। স্থপতি ভিক্টর লালু ১৯০০ সালের প্যারিস বিশ্বমেলার জন্য এটি নির্মাণ করেন। সময়ের সাথে রেলস্টেশনের ব্যবহার বদলে যায় এবং পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ভবনটি রূপান্তরিত হয় শিল্পকলা জাদুঘরে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
মিউজে দ’অর্সে
মিউজে দ’অর্সে |নয়া দিগন্ত

শিল্প, স্থাপত্য ও ইতিহাসের অনন্য ঠিকানা মিউজে দ’অর্সে এবার তার ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করবে একেবারেই ভিন্নধর্মী আয়োজনে। জাদুঘরের বিশাল ঐতিহাসিক নেফ বা কেন্দ্রীয় হল এক রাতের জন্য পরিণত হবে নাচ, আলো ও সম্মিলিত আনন্দের মঞ্চে। ফরাসি খ্যাতিমান মঞ্চনির্দেশক থমাস জোলির পরিকল্পনা ও পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ নৃত্য-উৎসব ‘বুম ১৯৮৬’।

আগামী ১২ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে এই বিশেষ আয়োজন। তবে অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবেই রাখা হয়েছে রহস্যের আবহ। দর্শনার্থীরা কী ধরনের পরিবেশনা, সংগীত কিংবা চমকের মুখোমুখি হবেন, তা আগেভাগে জানানো হবে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি হবে জাদুঘরের প্রচলিত প্রদর্শনী বা আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এক রাত।

মিউজে দ’অর্সের বর্তমান ভবনটির ইতিহাসও এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। ভবনটি মূলত ছিল একটি রেলস্টেশন। স্থপতি ভিক্টর লালু ১৯০০ সালের প্যারিস বিশ্বমেলার জন্য এটি নির্মাণ করেন। সময়ের সাথে রেলস্টেশনের ব্যবহার বদলে যায় এবং পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ভবনটি রূপান্তরিত হয় শিল্পকলা জাদুঘরে।

১৯৮৬ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ নতুন রূপে মিউজে দ’অর্সের উদ্বোধন করেন। ভবনটির অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন ইতালীয় স্থপতি গায়েত্তো আউলেন্তি। সেই ঐতিহাসিক বছরটিকেই স্মরণ করছে এবারের ‘বুম ১৯৮৬’ নাম।

অর্থাৎ, অনুষ্ঠানের নাম শুধু একটি পুরোনো বছরের প্রতি শ্রদ্ধা নয়; এটি মিউজে দ’অর্সের জন্ম ও রূপান্তরের ইতিহাসকেও সামনে নিয়ে আসছে।

এই বিশেষ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়া থমাস জোলির জন্য মিউজে দ’অর্সে নিজেই যেন একটি বিশাল নাট্যমঞ্চ। জাদুঘরের স্থাপত্য, বিশাল ঘড়ি, দীর্ঘ নেফ এবং অসংখ্য শিল্পকর্মের আবহকে কাজে লাগিয়েই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

জোলির দৃষ্টিতে, একজন মঞ্চনির্দেশকের জন্য দ’অর্সে ‘স্বপ্নের মতো একটি সেট’। তাই প্রচলিত অর্থে কোনো একটি নির্দিষ্ট মঞ্চে অনুষ্ঠান সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো ভবন ও তার বিভিন্ন অংশকে আয়োজনের অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশালাকৃতির ঘড়িটির নিচে দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করবে নানা চমক। পাশাপাশি আলো ও প্রক্ষেপণের মাধ্যমে জাদুঘরের বাইরের স্থাপত্যেও তৈরি করা হবে উৎসবের আবহ। সপ্তাহজুড়ে আলোকসজ্জা ও প্রক্ষেপণ জাদুঘরের ভবনটিকে রাতের প্যারিসে আরো দৃশ্যমান করে তুলবে।

মিউজে দ’অর্সে সাধারণত দর্শনার্থীরা দিনের বেলায় শিল্পকর্ম দেখতে যান। কিন্তু ‘বুম ১৯৮৬’-এর বিশেষত্ব হলো—জাদুঘর বন্ধ হওয়ার পর তার ভেতরের পরিবেশকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে অনুভব করার সুযোগ।

আয়োজকদের পরিকল্পনায় এটি শুধু নাচের অনুষ্ঠান নয়; বরং ভবনের ভেতর দিয়ে চলাফেরা, স্থাপত্যের বিশালতা অনুভব করা, আলো-ছায়ার পরিবর্তন এবং অন্য দর্শনার্থীদের সাথে একটি সম্মিলিত রাতের অভিজ্ঞতা তৈরি করা। ফলে জাদুঘর এখানে শুধু অনুষ্ঠানের স্থান নয়, নিজেই হয়ে উঠবে অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান চরিত্র।

‘বুম ১৯৮৬’ হবে মিউজে দ’অর্সের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠান। এর আগে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই চলবে নানা সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন।

২ ও ৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সেখানে মিউজে দ’অর্সে, এর ইতিহাস, সংগ্রহ এবং শিল্প ও সংস্কৃতিতে এর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আলোচনা হবে।

৪ ডিসেম্বর পুনরায় দর্শকদের জন্য খুলে দেয়া হবে জাদুঘরের অলংকার ও সজ্জাশিল্প-সংক্রান্ত গ্যালারিগুলো। এর মাধ্যমে ৪০ বছর পূর্তির আয়োজন শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাদুঘরের সংগ্রহ ও প্রদর্শনীকেও সামনে আনা হবে।

এরপর ৫ ও ৬ ডিসেম্বর থাকবে বিনামূল্যে জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ। এই দুই দিনের বিশেষ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন ফরাসি শিল্পী সোফি কাল। ফলে শিল্পী, দর্শক ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সপ্তাহান্তটি হয়ে উঠবে আরো প্রাণবন্ত।

এত বড় আয়োজন হলেও ‘বুম ১৯৮৬’-এ অংশ নেয়ার সুযোগ থাকবে সীমিত সংখ্যক মানুষের জন্য। মোট এক হাজার ৫০০টি আসন রাখা হয়েছে। অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হলে আগাম সংরক্ষণ করতে হবে।

টিকিটের বিক্রি শুরু হবে শরৎকালে। ফলে যারা ঐতিহাসিক মিউজে দ’অর্সের নেফে এই বিশেষ রাতের অংশ হতে চান, তাদের টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার সময়ের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।

মিউজে দ’অর্সের ৪০ বছর পূর্তির এই আয়োজন মূলত একটি প্রশ্নও সামনে আনছে—একটি জাদুঘর কি শুধু শিল্পকর্ম দেখার জায়গা, নাকি সেটি মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতারও অংশ হতে পারে?

থমাস জোলির ‘বুম ১৯৮৬’ সেই দ্বিতীয় ধারণাটিকেই সামনে আনছে। এখানে দর্শক শুধু শিল্প দেখবেন না; বরং ভবনের ভেতরে চলবেন, আলো ও সংগীতের সাথে মিশবেন এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাদুঘরকে অন্য এক পরিচয়ে আবিষ্কার করবেন।

রেলস্টেশন হিসেবে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯০০ সালের বিশ্বমেলায়, ১৯৮৬ সালে যে ভবন নতুন জীবন পেয়েছিল শিল্পের জাদুঘর হিসেবে, সেই একই স্থাপনা ৪০ বছর পর এবার রাতের নাচ ও উৎসবের মঞ্চে পরিণত হতে যাচ্ছে।

মাত্র এক হাজার ৫০০ মানুষের জন্য সেই রাতের দরজা খুলবে। তাই প্যারিসে শিল্প ও সংস্কৃতির পাশাপাশি একটু ব্যতিক্রমী রাতের অভিজ্ঞতা খুঁজছেন যারা, তাদের জন্য ‘বুম ১৯৮৬’ নিঃসন্দেহে হতে পারে বছরের অন্যতম আকর্ষণীয় আয়োজন।