ফ্রান্সসহ ইউরোপে পালিত বিজয় দিবস ‘ফেত দ্য লা ভিক্তোয়ার’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সংঘাত হিসেবে বিবেচিত। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারায়, ধ্বংস হয়ে যায় বহু শহর ও সভ্যতার নিদর্শন।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
বিজয় স্তম্ভে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ
বিজয় স্তম্ভে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ |নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়েছে “ফেত দ্য লা ভিক্তোয়ার” বা বিজয় উৎসব। ১৯৪৫ সালের ৮ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ইউরোপে যুদ্ধের অবসান ঘটে।

শুক্রবার (৮ মে) ঐতিহাসিক বিজয়কে স্মরণ করতেই প্রতিবছরের মতো এই দিনটি জাতীয় মর্যাদায় উদযাপন করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সংঘাত হিসেবে বিবেচিত। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারায়, ধ্বংস হয়ে যায় বহু শহর ও সভ্যতার নিদর্শন। যুদ্ধের শেষদিকে মিত্রবাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণের মুখে জার্মানি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৮ মে আত্মসমর্পণ করে। ইউরোপজুড়ে শুরু হয় আনন্দ ও স্বস্তির উল্লাস।

ফ্রান্সে দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফে অনুষ্ঠিত হয় প্রধান রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। সেখানে অজানা সৈনিকের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল মাক্রোঁ ও সামরিক কর্মকর্তারা। শহীদদের স্মরণে পালন করা হয় এক মিনিট নীরবতা। সামরিক ব্যান্ডের সুর এবং জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন।

এছাড়া দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয় সামরিক কুচকাওয়াজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা সভা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যাতে তারা যুদ্ধের ইতিহাস এবং শান্তির গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।

অনেক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধস্মৃতি বহনকারী মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তারা যুদ্ধকালীন কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং নতুন প্রজন্মকে মানবতা ও সহনশীলতার শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানান। এক প্রবীণ যোদ্ধা বলেন, যুদ্ধ কখনো মানবতার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। আমরা চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শান্তিপূর্ণ পৃথিবীতে বেড়ে উঠুক।

ফ্রান্সের বিভিন্ন জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধেও দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। অনেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান যুদ্ধের শহীদদের প্রতি। টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠান ও প্রামাণ্যচিত্র।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘ফেত দ্য লা ভিক্তোয়ার’ বা বিজয় উৎসব শুধু একটি ঐতিহাসিক দিবস নয়; এটি মানবতার বিজয়, স্বাধীনতার মূল্য এবং শান্তির প্রয়োজনীয়তার প্রতীক। বর্তমান বিশ্বে যখন নানা সংঘাত ও যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, তখন এই দিবস মানুষকে অতীতের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শান্তি ও ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয়।

ফরাসি জনগণের কাছে দিনটি জাতীয় গৌরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি বছর নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়ছে, যা ইতিহাসের প্রতি সম্মান ও দেশপ্রেমের চেতনাকে আরও শক্তিশালী করছে।

‘ফেত দ্য লা ভিক্তোয়ার’ বা বিজয় উৎসব কেবল বিজয় উদযাপনের দিন নয়; এটি আত্মত্যাগের স্মরণ, ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং বিশ্বশান্তির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। যুদ্ধের অন্ধকার পেরিয়ে মানবতার জয়ের যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, সেই স্মৃতিই আজও ফ্রান্স ও বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।