প্যারিসের বিলাসবহুল বিপণিতে ক্রেতার সংকট, উদ্বেগে বিক্রয়কর্মীরা

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্যারিসের প্রধান বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর দোকানে ক্রেতা উপস্থিতি প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পতন শুধু সাময়িক নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বৈশ্বিক বিলাসপণ্যের বাজারে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
প্যারিসের এক বিলাসবহুল বিপণি
প্যারিসের এক বিলাসবহুল বিপণি |নয়া দিগন্ত

একসময় বিশ্বের ধনাঢ্য ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকত ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিলাসবহুল বিপণিগুলো। ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হতো বিক্রয়কর্মীদের। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে দোকানে প্রবেশ করতে হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।

বর্তমানে দিনের অধিকাংশ সময়ই ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে বিক্রয়কর্মীদের। ক্রেতাশূন্য দোকান, বিক্রি কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে প্যারিসের বিলাসপণ্যের বাজারে নেমে এসেছে এক গভীর স্থবিরতা।

ফরাসি গণমাধ্যম ল্য মোঁদের সূত্রমতে, সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্যারিসের প্রধান বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর দোকানে ক্রেতা উপস্থিতি প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পতন শুধু সাময়িক নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বৈশ্বিক বিলাসপণ্যের বাজারে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চীন, রাশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা উচ্চবিত্ত পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায়। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলগুলোর ক্রেতারাই প্যারিসের বিলাসপণ্যের বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন। তারা নিয়মিতভাবে ব্যাগ, পোশাক, অলংকার, ঘড়ি ও অন্যান্য বিলাসবহুল পণ্য কিনতেন। কিন্তু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভ্রমণ ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাদের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বৃহত্তম বিলাসপণ্য প্রতিষ্ঠান এলভিএমএইচ -এর মালিকানাধীন বিখ্যাত ডিপার্টমেন্ট স্টোর লা সামারিতেন-এ। ২০২১ সালের জুন মাসে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে সংস্কারের পর পুনরায় চালু করা হয় ঐতিহাসিক এই বিপণি বিতানটি।

প্রায় ২০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই বিশাল শপিং কমপ্লেক্সকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় বিলাসবহুল কেনাকাটার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল পুনরায় চালুর তিন বছরের মধ্যে বছরে প্রায় ৫০ লাখ দর্শনার্থী আকর্ষণ করা। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।

জুলাই মাসে গ্রীষ্মকালীন ছাড়ের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলেও দোকানটির ভেতরে দেখা যায় এক ভিন্ন বাস্তবতা। ক্রেতার অভাবে বিক্রয়কর্মীরা অলস সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ মোবাইল ফোনে সময় পার করছেন, কেউ বিলাসবহুল ব্যাগের ধুলো ঝাড়ছেন, আবার কেউ সহকর্মীদের সাথে নিচু স্বরে গল্প করছেন। ব্যস্ত বিক্রয় পরিবেশের বদলে এখন সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্রয়কর্মী জানান, আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন একসাথে অনেক ক্রেতাকে সামলাতে হতো। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় কোনো ক্রেতা ছাড়াই। তার ভাষায়, ‘আগে ক্রেতারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করতেন, এখন আমরা সারাদিন ক্রেতার অপেক্ষায় থাকি।’

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিলাসপণ্যের বাজারের এই মন্দা শুধু ফ্রান্স নয়, গোটা ইউরোপের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। কারণ বিলাসপণ্যের বিক্রি, আন্তর্জাতিক পর্যটন এবং উচ্চমূল্যের ভোক্তা ব্যয় ফরাসি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্রেতা কমে গেলে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় নয়, কর্মসংস্থান, পর্যটন খাত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, আন্তর্জাতিক পর্যটনের পুনরুদ্ধার এবং প্রধান বাজারগুলোতে ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি না পাওয়া পর্যন্ত প্যারিসের বিলাসবহুল বিপণিগুলোর এই সংকট সহজে কাটবে না। ফলে একসময় ব্যস্ততায় ভরা এই দোকানগুলোতে আপাতত অপেক্ষাই যেন বিক্রয়কর্মীদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।