ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণে সরকারি সফরে প্যারিসে আসছেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান।
আজ রোববার ২৩ আগস্ট থেকে সোমবার ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দুই দিনের এই সফরে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের মধ্যকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরো জোরদারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্কট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ফরাসী গণমাধ্যম উয়েস্ট-ফ্রঁস এর সূত্রমতে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের দফতর এলিজে প্রাসাদ জানিয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির প্রশ্নে উপসাগরীয় অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের বিষয়টি এবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
সৌদি যুবরাজের এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ইরান, ইয়েমেন ও লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে। ফ্রান্সও সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সাথে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করে আসছে। এ কারণে ম্যাক্রোঁ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের সরকারি কার্যসূচিতে চলতি বছর সৌদি যুবরাজের সাথে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক আলোচনা থাকার বিষয়টিও এ সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে।
মোহাম্মদ বিন সালমানের ফ্রান্স সফর শুরু হবে আজ রোববার একটি বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। তিনি প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য ই-স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড কাপ-এর একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। সৌদি আরবের বাইরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বব্যাপী ভিডিও গেম প্রতিযোগিতাকে দুই দেশের মধ্যে ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও বিনোদন খাতে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার একটি প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রীড়া ও বিনোদন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ফ্রান্সও এই খাতগুলোকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছে।
সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুও সৌদি যুবরাজকে প্যারিসের ঐতিহাসিক হোটেল দে জ্যাঁভালিদে স্বাগত জানাবেন। এরপর ম্যাক্রোঁ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো ফ্রাঙ্কো-সৌদি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কাউন্সিলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে আরো সুসংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
ফ্রান্স ও সৌদি আরবের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে শুধু ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মতো একাধিক ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে বহুমুখী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দেশটির ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় পর্যটন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বিনোদন ও ক্রীড়া খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব বাড়ানো সৌদি আরবের অন্যতম লক্ষ্য।
অন্যদিকে ফ্রান্সও সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি জ্বালানি ও বিমান চলাচল খাতেও উল্লেখযোগ্য যোগাযোগ রয়েছে। ফলে আসন্ন বৈঠকে নতুন বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব আরো সম্প্রসারণের বিষয় উঠে আসতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প গুলোতে ফরাসি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে এবারের সফরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ফরাসি প্রেসিডেন্টের দফতরের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই নেতা এমন এক সময়ে আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের দাবি করছে। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট এবং লেবাননের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছাড়াও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ফ্রান্সের দৃষ্টিতে উপসাগরীয় অংশীদারদের সাথে সমন্বয় বাড়ানো আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রান্সের কূটনৈতিক অবস্থানও এই বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্য দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে প্যারিস একদিকে যেমন আঞ্চলিক সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেয়, অন্যদিকে সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী উপসাগরীয় শক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ম্যাক্রোঁ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠককে ফ্রান্সের মধ্যপ্রাচ্য নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সৌদি যুবরাজের সাথে ম্যাক্রোঁর যোগাযোগ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরও দুই নেতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের সরকারি কার্যসূচিতে ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও মে মাসে মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে আলোচনার উল্লেখ রয়েছে। এসব আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্ব পেয়েছে।
এবারের প্যারিস সফর তাই দুই দেশের সম্পর্কের জন্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন পর্যায়ের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে সৌদি আরব ফ্রান্সের সাথে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে প্যারিস উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের কূটনৈতিক প্রভাব এবং অংশীদারিত্ব আরো দৃঢ় করতে আগ্রহী। এর সাথে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা সঙ্কট যুক্ত হওয়ায় ম্যাক্রোঁ-মোহাম্মদ বিন সালমান বৈঠনের দিকে আন্তর্জাতিক মহলেরও নজর থাকবে।
দুই দিনের সফর শেষে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন কোনো চুক্তি, বিনিয়োগ বা কৌশলগত সমঝোতার ঘোষণা আসে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দুই দেশ কী ধরনের অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে এবং আঞ্চলিক সঙ্কট মোকাবিলায় কী ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলে, তা এই সফরের অন্যতম প্রধান ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।



