ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২৭

জনমত জরিপে শীর্ষে ডানপন্থি বারদেলা ও মারিন

৮ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে পরিচালিত এই জরিপে কোটা পদ্ধতিতে নির্বাচিত ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী এক হাজার ফরাসি নাগরিক অংশ নেন।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
ডানপন্থী দল রাসেম্বলমঁ নাসিওনাল-এর (আরএন) দুই শীর্ষ নেতা জর্ডান বারদেলা ও মারিন ল্য পেন
ডানপন্থী দল রাসেম্বলমঁ নাসিওনাল-এর (আরএন) দুই শীর্ষ নেতা জর্ডান বারদেলা ও মারিন ল্য পেন |নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সের ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভেরিয়ান পরিচালিত এবং ল্য ফিগারো ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এই জরিপে দেখা গেছে, ডানপন্থী দল রাসেম্বলমঁ নাসিওনাল-এর (আরএন) দুই শীর্ষ নেতা জর্ডান বারদেলা ও মারিন ল্য পেন প্রেসিডেন্ট সুলভ নেতৃত্বের প্রায় সব সূচকেই অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনায় স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে, বামপন্থী শিবির এখনো এমন কোনো নেতাকে সামনে আনতে পারেনি, যিনি এই দুই নেতার সাথে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম।

জরিপে প্রেসিডেন্ট সুলভ নেতৃত্ব মূল্যায়নের জন্য চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়। সেগুলো হলো—একজন ভালো প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতা, ফ্রান্স ও ফরাসি জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতা, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা।

জরিপ অনুযায়ী, মারিন ল্য পেনকে ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা একজন দক্ষ প্রেসিডেন্ট হওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করেন। একই শতাংশ তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে। দেশের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতার ক্ষেত্রেও তিনি ৪৩ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। অন্যদিকে, জর্ডান বারদেলা ফ্রান্স ও ফরাসি জনগণের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ সমর্থন অর্জন করেন, যা জরিপের সব সূচকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে দক্ষতার প্রশ্নে তিনি ৪১ শতাংশ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ৪৪ শতাংশ এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতায় ৪১ শতাংশ সমর্থন পান।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই নেতার জনপ্রিয়তার ধরন কিছুটা ভিন্ন। মারিন ল্য পেনকে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে দেখা হলেও জর্ডান বারদেলা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন। ফলে ডানপন্থী রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রশ্নে দু‘জনের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়েছে।

জরিপে আরো দেখা যায়, গত মাসের তুলনায় মারিন ল্য পেনের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দক্ষতার ক্ষেত্রে তিনি তিন শতাংশ পয়েন্ট এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতায় এক শতাংশ পয়েন্ট সমর্থন বাড়িয়েছেন।

অন্যদিকে, জর্ডান বারদেলা প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এক শতাংশ পয়েন্ট এগোলেও সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতার সূচকে দুই শতাংশ পয়েন্ট হারিয়েছেন।

শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে জর্ডান বারদেলার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। এই শ্রেণির ৫৯ শতাংশ মনে করেন তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যথেষ্ট দক্ষ। ৬৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন তিনি ফ্রান্সকে সঠিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন এবং ৬০ শতাংশ তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। একই শ্রেণির ভোটারদের মধ্যে মারিন ল্য পেন ৫৪ থেকে ৫৯ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। তবে প্যারিস ও আশপাশের নগরাঞ্চলে দুই নেতার জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম।

ডানপন্থী এই দুই নেতার পরেই অবস্থান করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপ। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দক্ষতার প্রশ্নে ৩৫ শতাংশ, প্রতিনিধিত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ৩১ শতাংশ এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতায় ৩২ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। জুন মাসের তুলনায় চারটি সূচকেই তার অবস্থানের সামান্য উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপন্থী ও ডানপন্থী ভোটারদের পাশাপাশি বামপন্থীদের একটি অংশও তাকে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে ভোট দেয়া ভোটারদের ৭১ শতাংশ মনে করেন, এদুয়ার ফিলিপ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের যোগ্য।

এদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আতাল এবং রিপাবলিকান দলের নেতা ব্রুনো রেতাইয়ো প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছেন। দু‘জনই বিভিন্ন সূচকে ২৩ থেকে ২৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। তবে আতালের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে, বিশেষ করে দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্নে। অন্যদিকে, ব্রুনো রেতাইয়ো জাতীয় পর্যায়ে খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও রিপাবলিকান দলের সমর্থকদের মধ্যে তার অবস্থান শক্তিশালী।

বামপন্থী রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। দক্ষতার ক্ষেত্রে তিনি চার শতাংশ পয়েন্ট, ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সাত শতাংশ পয়েন্ট এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতায় ছয় শতাংশ পয়েন্ট সমর্থন বাড়িয়েছেন। তবুও তার সামগ্রিক সমর্থন এখনো ২২ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সমাজতান্ত্রিক নেতা রাফায়েল গ্লুকসমানও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেননি। আর বামপন্থী নেতা জ্যাঁ-লুক মেলঁশঁ জরিপের সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রে তিনি মাত্র ১৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন এবং অধিকাংশ উত্তরদাতা তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উপযুক্ত মনে করেননি।

জরিপে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বা কোত দাভেনির সূচকেও মারিন ল্য পেন ও জর্ডান বারদেলা যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন। ৪৪ শতাংশ ফরাসি নাগরিক আগামী মাস ও বছরগুলোতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা দেখতে চান। এদুয়ার ফিলিপ ৩১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তৃতীয়, গ্যাব্রিয়েল আতাল ২৭ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ এবং ব্রুনো রেতাইয়ো ২৫ শতাংশ নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন। রাফায়েল গ্লুকসমান ১৯ শতাংশ, জ্যাঁ-লুক মেলঁশঁ ১৮ শতাংশ এবং ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ১৫ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।

২০২৬ সালের ৮ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে পরিচালিত এই জরিপে কোটা পদ্ধতিতে নির্বাচিত ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী এক হাজার ফরাসি নাগরিক অংশ নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জরিপের ফলাফল স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরাসি রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে রাসেম্বলমঁ নাসিওনাল। বিশেষ করে জর্ডান বারদেলা ও মারিন ল্য পেনকে ঘিরেই আগামী নির্বাচনের প্রধান রাজনৈতিক লড়াই আবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।