পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর পর ফ্রান্স প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে গণভোট ও নির্বাচন নিয়ে ভাবনা

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকদের মধ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও নির্বাচন ঘিরে আগ্রহ ও আলোচনার মাত্রা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাওয়ার পর প্রবাসীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও মতামত আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
পোস্টাল ব্যালট গণভোট ও নির্বাচনের ছবি
পোস্টাল ব্যালট গণভোট ও নির্বাচনের ছবি |নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকদের মধ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও নির্বাচন ঘিরে আগ্রহ ও আলোচনার মাত্রা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাওয়ার পর প্রবাসীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও মতামত আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।

প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁসহ বিভিন্ন শহরে বসবাসরত বাংলাদেশীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই প্রথমবারের মতো দূরদেশে বসে নিজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

মার্সেই শহরে বসবাসরত সোহাইল আহমেদের মতে, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা প্রবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়নের একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এজন্য তারা চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্রের দায়িত্ব আসা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

তবে এই সন্তুষ্টির পাশাপাশি কিছু প্রশ্ন ও উদ্বেগও উঠে এসেছে। কয়েকজন প্রবাসী জানান, ব্যালট পাঠানো ও গ্রহণের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। ডাকযোগে ব্যালট পৌঁছাবে কি না, সময়মতো গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, এসব বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করেছে অনেকের মনে। বিশেষ করে যারা দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেন, তারা ডাক ব্যবস্থার ধীরগতিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

২৫ জানুয়ারি ছিল পোস্টাল ব‍্যালট প্রেরণের শেষ দিন। এবার এতে অংশ নিয়েছে ৮,৩৭৮ জন ফ্রান্স প্রবাসী বাংলাদেশী।

গণভোট ও নির্বাচন প্রসঙ্গে মতামত দিতে গিয়ে প্রবাসীরা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ও সমালোচনা দুটোই প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, ভোটের মাধ্যমে মত প্রকাশের সুযোগ থাকাই গণতন্ত্রের মূল শক্তি, আর প্রবাসীদের যুক্ত হওয়া সেই শক্তিকে আরো বিস্তৃত করে। অন্যদিকে, কিছু প্রবাসী রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং ভোটের প্রকৃত প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ফ্রান্স প্রবাসী একটি সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি জানান, পোস্টাল ব্যালট একটি ভালো উদ্যোগ, তবে ভবিষ্যতে অনলাইন বা ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ের মতো আরও আধুনিক পদ্ধতি চালু হলে অংশগ্রহণ বাড়বে এবং আস্থাও জোরদার হবে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়া ফ্রান্স প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গণভোট ও নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। এটি যেমন অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়িয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে প্রবাসী ভোটাধিকার আরো কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করার দাবি জোরালো করেছে। প্রবাসীদের কণ্ঠস্বর যে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; এই উপলব্ধিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

গণভোটের প্রশ্নে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। লিয়ঁ শহরে কর্মরত কয়সর মাহমুদের মতে, পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেয়ার সুযোগ তৈরি হলেও, গণভোটের মূল প্রশ্ন ও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রবাসীদের ভাবনায় ছিল আগ্রহ, সংশয় ও বিশ্লেষণের মিশ্র প্রতিফলন।

ফ্রান্স প্রবাসীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, গণভোটের ধারণা নিজেই গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে তারা তাত্ত্বিকভাবে সমর্থন করেন। অনেক প্রবাসীর ভাষায়, গণভোট মানে জনগণের কণ্ঠস্বর। এটি শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রও শক্তিশালী হয়।

তবে সমর্থনের পাশাপাশি গণভোটের প্রশ্নটি কতটা স্পষ্ট ও বোধগম্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। প্রবাসীদের একটি অংশ জানান, গণভোটে উত্থাপিত বিষয়ের আইনি ও সাংবিধানিক প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তাদের ছিল না। সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা ও নিরপেক্ষ তথ্যের অভাবে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে অনুমানের ওপর নির্ভর করেছে বলে তারা মনে করেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা ছিল, গণভোটের ফলাফল বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হবে। ফ্রান্স প্রবাসী অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, গণভোট তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার ফল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে। অন্যথায় এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থাকে।

প্রবাসীদের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে স্বচ্ছতা ও আস্থার প্রশ্ন। ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও ভোটের নিরাপত্তা, গণনার নির্ভরযোগ্যতা এবং ফল প্রকাশের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তারা পুরোপুরি আশ্বস্ত নন। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তা গণভোটের গুরুত্বকে কিছুটা ম্লান করেছে বলে মত অনেকের।

তবু ইতিবাচক দিক হলো, গণভোট ফ্রান্স প্রবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়িয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে আলোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতবিনিময় এবং দেশের সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। প‍্যারিসে বসবাসরত ফাতেমা বেগম এই প্রসঙ্গে বলেন, এই সচেতনতা ভবিষ্যতে আরও সংগঠিত প্রবাসী অংশগ্রহণের পথ তৈরি করতে পারে।

সামগ্রিকভাবে ফ্রান্স প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভাবনায় গণভোট একটি সম্ভাবনাময় কিন্তু এখনও অসম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে গণভোটের প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হবে, তথ্যভিত্তিক প্রচার বাড়বে এবং ফলাফলের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। তাহলেই প্রবাসীদের চোখে গণভোট সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।